ভাষা আন্দোলনে বগুড়া জেলা

  • নিউজ ডেস্ক     | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২২, ০৭:২৪ পিএম
ভাষা আন্দোলনে বগুড়া জেলা

ঢাকা : মাতৃভাষাকে ঘিরে যে গণ-আন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালে তা শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সেই আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ নানারকমের বিভেদকে একপাশে সরিয়ে রেখে সেই মহান আন্দোলন গণমানুষকে দিয়েছিল সংহতি। ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে সমসাময়িক বগুড়া জেলায় যেসব তৎপরতা চলে সেসব ঘটনা জাতীয় সংহতিতে ভূমিকা রাখে।

বগুড়া শহরে প্রথমবারের মতো প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় গণপরিষদে খাজা নাজিমুদ্দীনের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে ন্যক্কারজনক ভূমিকার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। আযিযুল হক কলেজ থেকে ছাত্র ফেডারেশনের নেতা ও সাহিত্য কর্মী মুহম্মদ আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হলে সেখানে হামলা চালায় মুসলিম লীগের নেতা ও সমর্থকরা। ভাষা আন্দোলনে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। এদিন আযিযুল হক কলেজে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয় যার উদ্দেশ্য ছিল প্রদেশব্যাপী (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ধর্মঘট সফল করা। কবি আতাউর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত সেই কমিটিতে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। গোলাম মজিউদ্দিনের বোন সালেহা খাতুন এবং ডা. মোজাফফর আহমেদের বোন রহিমা খাতুনের সেই কমিটিতে সম্পৃক্ততা ছিল। এদিন আযিযুল হক কলেজ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করার জন্য বেরিয়ে পড়ে। এই মিছিলের প্রথম সারিতে ছিলেন আযিযুল হক কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ভাষাসৈনিক গাজিউল হক। পরে মিছিল শেষে বগুড়া জিলা স্কুলের মাঠে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন এবং অসাধারণ এক বক্তৃতায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। বহুভাষাবিদ এই জ্ঞানতাপসের অংশগ্রহণে বগুড়ায় চলমান ভাষা আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে।

১৯৪৮ সালের ২৯ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বগুড়া সফরকে কেন্দ্র করে অবাঙালি জেলা প্রশাসক আবদুল মজিদের হঠকারিতায় এক প্রচণ্ড ছাত্রবিক্ষোভ হয়। ছাত্রনেতা গোলাম রহমান এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এসব বিক্ষোভে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও শাহ আজিজপন্থি সরকার সমর্থক ছাত্রদল ব্যাপক বাধা দিতে থাকে। এদের আক্রমণে মারাত্মকভাবে আহত হন জননেতা মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের পুত্র এস এম নুরুল আলম, গোলাম মো. মহিউদ্দিন, আবুল ফজল সিদ্দিকী ও নূর মোহাম্মদ খান। ১৯৪৮ সালের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আরো যাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় তারা হলেন আতিউর রহমান, অধ্যাপক গোলাম রসুল, মুহাম্মদ আব্দুল মতিন, অধ্যাপক আবুল খায়ের, অধ্যাপক পৃত্থিশ দত্ত, আতাউর রহমান, গাজিউল হক প্রমুখ।

১৯৫০ সাল বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যাওয়া খুবই দুহূহ হয়ে ওঠে। শাসকগোষ্ঠীর দোসররা নানাভাবে এই আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করে। আন্দোলন যাতে দানা বেধে উঠতে না পারে সে জন্য তারা পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীকে লেলিয়ে দেয় আন্দোলনকারীদের ওপর। গ্রেপ্তার হন অসংখ্য ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-শিল্পী-সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী। কঠোর দমন-পীড়নের ফলে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মানুষদের সাথে সাধারণ জনগণের যোগাযোগ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৫১ সালের মাঝামাঝি এই অবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। কমিউনিস্ট পার্টি একটি ‘কন্ট্রাক্ট কমিটি’ তৈরি করে এর মাধ্যমে আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে।

এই কমিটির মাধ্যমেই জননেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আন্দোলনকে গতিশীল করে তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৫২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়। এই কমিটি গঠন হবার পর পরই বগুড়ায় ভাষা আন্দোলন বেগবান হয়। ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি এই কমিটির আহ্বানে জিলা স্কুল ময়দানে বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনা জানামাত্র বগুড়ায় দিনব্যাপী হরতাল পালিত হয়। পরের দিনও হরতাল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন চলতে থাকে। সেদিন থেকে টানা ১৮ দিন বগুড়ার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে এই আন্দোলন চলতে থাকে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনের গতি উজ্জীবিত থেকেছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

Link copied!