কোরবানির হাটে গরু সংকটের আশঙ্কা

  • সাজ্জাদ হোসাইন | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মে ১৭, ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
কোরবানির হাটে গরু সংকটের আশঙ্কা

ফাইল ছবি

আসন্ন ঈদুল আজহার আর মাত্র কিছুদিন বাকি। এর মধ্যেই দেশের কোরবানির পশুর বাজারগুলো নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। খামারি ও বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এবার সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সহজ দামে কাঙ্ক্ষিত গরু মেলা বেশ কঠিন হতে পারে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে প্রতিবেশী দেশ থেকে গরু আমদানি ও পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাইরাসজনিত ‘লাম্পি স্কিন’ রোগের কারণে অসংখ্য দেশি গরুর আকস্মিক মৃত্যু।

মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় হঠাৎ করেই গবাদিপশুর মধ্যে ভাইরাসজনিত লাম্পি স্কিন রোগের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে চরম দুশ্চিন্তা ও বিপাকে পড়েছেন খামারি এবং প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা। এই রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে প্রথমে গুটি বা পক্সের মতো ক্ষত বের হয়। পরবর্তী সময়ে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা ও জ্বরের কারণে পশুটি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার অভাবে আক্রান্ত পশুর মৃত্যু হচ্ছে। গবাদিপশু নিয়ে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে অনেকে কোরবানির হাটের জন্য প্রস্তুত করা সাধের গরু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ের এই আতঙ্ককে কিছুটা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের দাবি, রোগটি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। ভ্যাকসিনের সহজলভ্যতা ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

লাম্পি স্কিন রোগের এই ধাক্কার পাশাপাশি পশুর বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে ভারতীয় গরুর অনুপস্থিতি। সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারির কারণে গত কয়েক বছর ধরেই দেশে ভারতীয় গরু আসার হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে কোরবানির পশুর বাজার এখন সম্পূর্ণ দেশীয় খামারিদের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু একদিকে রোগব্যাধির কারণে পশুর মৃত্যু এবং অন্যদিকে পশুখাদ্যের চড়া দামের কারণে খামারিদের উৎপাদন খরচ এমনিতেই অনেক বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে চাহিদার তুলনায় সুস্থ ও পর্যাপ্ত পশুর জোগান কম থাকলে কোরবানির গরুর দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

এদিকে, ময়মনসিংহের সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু চোরাচালান কার্যক্রম অব্যাহত থাকার গুঞ্জনে আতঙ্কে আছেন দেশি খামারিরা। কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্তে গরু চোরাচালান চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ভারতীয় গরু প্রবেশ বন্ধে সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করার কথা জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানান, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় অবৈধপথে গরু প্রবেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি চক্র। দেশি গরু খামারিদের অভিযোগ, দেশে গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও পরিচর্যায় খরচ বেড়ে যাওয়ায় কোরবানির হাটগুলোতে ভারতীয় গরু অবাধে ঢুকলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে তাদের।

ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী উপজেলা হালুয়াঘাট এলাকার গরুর খামারি কামরুল হাসান জানান, গরুর খাদ্য ও পরিচর্যায় ব্যয় বাড়ায় এমনিতেই লোকসানে আছেন খামারিরা। তার ওপর যদি সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু জেলার বিভিন্ন হাটগুলোতে প্রবেশ করে, তাহলে দেশি গরুর দাম অর্ধেকে নেমে আসবে। দেশীয় খামারিদের বাঁচাতে তিনি ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধের দাবি জানান।

আরেক খামারি আব্দুস সালাম জানান, পবিত্র কোরবানি ঈদ আসার আগেই সীমান্ত এলাকার চোরাচালানিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা ভারত থেকে কম দামে গরু এনে বাংলাদেশের বিভিন্ন হাটবাজারে পাঠিয়ে দেয়। তখন দেশি গরুর দাম অনেকটা কমে যায় এবং সারা বছর গরু লালন-পালন করে দেশি খামারিদের লোকসান গুনতে হয়। এবারও শোনা যাচ্ছে ভারতীয় গরু চোরাকারবারিরা সক্রিয় হচ্ছে। চোরাকারবারি বন্ধ করা না গেলে দেশি খামারিরা বরাবরের মতো লোকসানেই পড়বেন। তিনি বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান।

অবশ্য সীমান্ত পার হয়ে কোনো অবৈধ পশু যাতে দেশে ঢুকতে না পারে, সে জন্য কড়া পাহারার কথা জানিয়েছে বিজিবি। ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন ৩৯ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল নুরুল আজিম বায়েজীদ জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ বন্ধে সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জায়গা চিহ্নিত করে বিশেষ টিম ২৪ ঘণ্টা টহল দিচ্ছে।

এদিকে জেলা পুলিশ প্রশাসনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, গরু চোরাচালান রোধে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে থানাগুলোকে। আটক করা হচ্ছে চোরাকারবারিদের।

তবে খামারিদের এই আতঙ্কের মধ্যেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান কিছুটা স্বস্তির কথা বলছে। চলতি বছর জেলাটিতে কোরবানির পশুর চাহিদা ১ লাখ ৮১ হাজারের বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার পশু। সরকারি হিসাব অনুযায়ী জোগান উদ্বৃত্ত থাকলেও, শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের রোগবালাই ও বাজার ব্যবস্থাপনার টানাপোড়েন কাটিয়ে হাটে পশুর সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এসএইচ 

Link copied!