ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ১১-দলীয় জোটের ভেতরে দেখা দিয়েছে জটিল সমীকরণ। দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে সবচেয়ে বড় চাপের মুখে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। কারণ, গত কয়েক বছরে সংগঠনিক কাজ ও ভোটার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে যেসব আসনকে তারা ‘গ্রিন’ পর্যায়ে নিয়ে গেছে, সেগুলোর দিকেই তাকিয়ে আছে জোটের অন্য শরিকরা।
জামায়াতের দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, গত পাঁচ বছরে ভোটারদের এলাকা পরিবর্তন, সামাজিক কার্যক্রম, সাংগঠনিক বিস্তার ও স্থানীয় নেতৃত্ব শক্তিশালী করার মাধ্যমে অন্তত ৭০টি আসনকে তারা প্রতিযোগিতার উপযোগী পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসতেই সেই আসনগুলোর মালিকানা নিয়ে শুরু হয়েছে টানাহেঁচড়া।
জোটের শরিক কয়েকটি ছোট দল, বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই পীরের দল), সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটিগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চরমোনাইয়ের সারাদেশে উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক থাকলেও তারা এখনো এমন কোনো জেলা বা আসন গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে জয় নিশ্চিত করার মতো অবস্থান রয়েছে। ফলে জামায়াতের তৈরি করা ‘গ্রিন আসন’ই তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
এই সমীকরণে চরমোনাইয়ের কৌশলটি ভিন্ন। তাদের ভোট দিয়ে সংসদের উচ্চ কক্ষে বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দরকষাকষিতে সুবিধা নেওয়ার চিন্তা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে মাঠের রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে জামায়াতের ওপর।
নারায়ণগঞ্জে একসময় জামায়াতের তিনটি গ্রিন আসন ছিল বলে দলীয় নেতাদের দাবি। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জমিয়তে উলামার প্রভাবের কারণে সেসব আসনে সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে ইতিমধ্যে সেখান থেকে দুটি আসন কার্যত হাতছাড়া হয়েছে।
ঢাকা–১১ আসনেও একই চিত্র। স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই আসনে জামায়াতের পক্ষে অন্তত ৩৫ থেকে ৫০ হাজার নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছিল। তবুও আসনটি জামায়াতের ঝুলিতে না রেখে এনসিপিকে দেওয়া হয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এদিকে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সাতক্ষীরার দিকেও নজর পড়েছে চরমোনাইয়ের। স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্তরা বলছেন, এখানে মূল খেলাটি খেলছে চরমোনাই। জোটের সমঝোতার অংশ হিসেবে জামায়াত অনেক আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়নি। এখন চরমোনাই যদি শেষ মুহূর্তে অবস্থান বদলায়, তাহলে জামায়াত বড় বিপাকে পড়বে-এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি অংশ মূলত বুদ্ধিজীবী পরামর্শনির্ভর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যেখানে মাঠপর্যায়ের মতামত তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। সম্প্রতি কয়েকটি আসনে মনোনয়ন ছেড়ে দেওয়া প্রার্থী ও তাঁদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ্র থেকে শুধু ফোন করে জানানো হয়েছে-মনোনয়নপত্র জমা না দিতে।
মাঠপর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, কোনো আলোচনা ছাড়াই এ ধরনের সিদ্ধান্ত জানানো হচ্ছে। প্রার্থীরা অসহায়ের মতো সেটি মেনে নিচ্ছেন, কিন্তু এতে কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন যত এগোচ্ছে, জোটের ভেতরের এই টানাপোড়েন তত স্পষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন ভাগাভাগিতে ভারসাম্য না আনতে পারলে জামায়াত যেমন সাংগঠনিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, তেমনি পুরো ১১-দলীয় জোটও নির্বাচনী মাঠে দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত সমঝোতার রাজনীতি না কি পারস্পরিক সন্দেহ-কোন পথে হাঁটে জোট।
এসএইচ
আপনার মতামত লিখুন :