ফাইল ছবি
রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন যেমন নতুন সুযোগ আনে, তেমনি কখনো কখনো তা ডেকে আনে পুরোনো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি। দীর্ঘ দেড় দশক পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর বিএনপির সামনে এখন বড় পরীক্ষা মাঠপর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন। কিন্তু ভোটের সুনির্দিষ্ট তফসিল ঘোষণার আগেই দলটির নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে তৃণমূলের রাজনৈতিক আচরণ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাটবাজার, ঘাট, বাসস্ট্যান্ড দখল এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অতি-উৎসাহী ভূমিকা দলের ভাবমূর্তিকে এক বড় ধরনের জনপ্রিয়তার সংকটে ফেলেছে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর হঠাৎ শাসনভার আসায় তৃণমূলের একটি অংশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং নানা অজুহাতে চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা বিগত সরকারের আমলের নেতিবাচক স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের নীরব অসন্তোষ দানা বাঁধছে, যা আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সম্ভাব্য স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় খেসারতের কারণ হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণের যে সুযোগ এসেছে, তা তৃণমূলের এই শৃঙ্খলাহীনতার কারণে ভেস্তে যেতে পারে।
তবে দলের হাইকমান্ড এই সংকট নিয়ে সম্পূর্ণ অজানা নেই। তারা ভালো করেই জানেন যে, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অর্থাৎ নির্দলীয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্রোহী প্রার্থী ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলানোর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনমনে ক্ষুণ্ণ হওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা। তাই তৃণমূলের এই ইমেজ সংকট দূর করতে কেন্দ্র থেকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বিতর্কিত, দখলদার ও চাঁদাবাজিতে অভিযুক্ত নেতাদের তালিকা তৈরি করে তাদের লাল কার্ড দেখানোর প্রক্রিয়া চলছে।
জনপ্রিয়তার এই ক্ষয়িষ্ণু গ্রাফকে টেনে ধরতেই এখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ‘ক্লিন ইমেজ’ বা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের দিকে ঝুঁকছেন। বিগত দিনে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকার করেছেন অথচ ক্ষমতার মোহে অন্ধ হননি, এমন নেতাদেরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনানুষ্ঠানিক গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে দলের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতার চার মাসের মাথায় এসে বিএনপি এখন এক মনস্তাত্ত্বিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে স্থানীয় সরকারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার তাগিদ, অন্যদিকে তৃণমূলের চাঁদাবাজি রুখে সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখার কঠিন লড়াই। শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের এই বিশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমন করে দলটি কতটা জনপ্রিয়তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের আগামীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
এসএইচ
আপনার মতামত লিখুন :