ঢাকা: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে নিজের বক্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝির জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। শনিবার (২৯ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিতা চেয়ে দেওয়া বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ সম্পর্কে অনিচ্ছাকৃত ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাম্প্রতি বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা, সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতোই। এ বক্তব্যের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় আসলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। সেখানকার আলেম-ওলাদের ওপর দিয়েছেন। তাদের ভাবমূর্তি বিশ্বের সামনে ক্ষুণ্ন করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের কনসার্ট বন্ধ হওয়ার খবর মিডিয়ায় যেভাবে এসেছিল, বাস্তব চিত্র তা থেকে আলাদা ছিল। গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। তাই শিক্ষার্থীরা সাউন্ড কমাতে বলে। এ নিয়ে পুলিশ ও শিক্ষর্থীদের কথা কাটাকাটি থেকে পরবর্তী ঘটনা ঘটে। কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন পুলিশের লাঠিপেটায়।’
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘মিডিয়ায় ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলেও, ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা স্পষ্ট মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করে দেয়নি। তারা শুধু শব্দ কমাতে বলেছিলেন। এর মানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ নয়, যেমনটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সম্পর্কে ভুল বার্তা দিয়েছিলেন, তাদের ছোট করেছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে নৌকাবাইচের বিষয়টিতে স্থান নিয়ে আমার তথ্যগত ত্রুটি হয়েছে। সিলেটের জায়গায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলে ফেলি। এ ত্রুটিতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আমি বিব্রত। অনাকঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। যদিও পাশাপাশি মূল ঘটনা কী ছিল, মিডিয়া কী ফ্রেমিং করেছে, সেটা নিয়ে সংসদে কথা বলা আমার উচিত ছিল; কিন্তু সম্পূরক প্রশ্নে সময় সীমাবদ্ধতার কারণে বিস্তারিত বলার সুযোগ ছিল না।’
হাসনাত বলেন, ‘সবশেষে একটি কথা আমি পুনর্ব্যক্ত করছি—আমি এবং আমার দল আমরা জুলাইয়ের আদর্শকে ধারণ করি এবং সব নীতি, সিদ্ধান্ত সেই আদর্শের ওপর নির্ভর করেই নিতে চাই। জুলাই একটা সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং কেউ কারও মত বা দৃষ্টিভঙ্গি আরেকজনের ওপর চাপিয়ে দেবে না। বিতর্ক থাকবে, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকবে, কিন্তু কেউ কাউকে জোর করবে না, তার মতামতকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মতামত হিসেবে গ্রহণ করতে। জুলাই এই কমন মিনিমাম গ্রাউন্ডের (common minimum ground) ঐক্যের প্রতীক।’
তিনি বলেন, ‘এই আদর্শের প্রতি আমি কমিটেড ছিলাম, আছি, থাকবো। তার ভিত্তিতেই আমি বিশ্বাস করি যে, যদি কোনও গ্রুপ বা ব্যক্তি যদি অন্যায়ভাবে কারও ওপর জোর খাটান, কাউকে বাধ্য করেন নিজের মতামতকে চাপিয়ে দিতে, তাহলে সরকারের দায়িত্ব সেটাকে প্রতিহত করা। সব মানুষের সমান অধিকারকে নিশ্চিত করা। সরকার যখন সেই দায়িত্ব পালনে দ্বিধা করে, অস্বীকৃতি জানায়, তখন দেশের আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, সরকারের ব্যর্থতাই প্রমাণিত হয়। আমি এই কথাটাই সংসদে বলতে চেয়েছি। এই বাংলাদেশ সবার—এই বাংলাদেশে মসজিদ থাকবে, মন্দির থাকবে, সংগীত থাকবে, ওয়াজ থাকবে, মাজার থাকবে, কনসার্ট হবে, মাহফিল হবে, রথযাত্রা হবে, সিনেমা উৎসব হবে, আবার বিজ্ঞ আলেমদের আলোচনাও হবে। সব ধর্মের, মতের মিলনস্থল আমার এই বাংলাদেশ। যার যেটা পছন্দ হবে, সে সেটায় যাবে, অংশ নেবে, যার যেটা পছন্দ হবে না, সে সেটায় যাবে না। আর সরকার এটুকু নিশ্চিত করবে, কেউ যেন আরেকজনের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে, এমন কিছু করতে না পারে।’
তিনি বলেন, ‘আজকে সরকার সেই নিরাপত্তা দিতে পারছে না এবং এর ফলে সমতার যে বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাচ্ছি, তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
হাসনাত বলেন, ‘জুলাই ছিল ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সবার আন্দোলন। জুলাই ছিল মানুষকে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন, সর্বজনীন সমাজ গড়ে তোলার আন্দোলন; যা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান করবে। আমাদের চেষ্টা সেই বাংলাদেশ গড়বার জন্য, সে চেষ্টাই আমরা করছি এবং করে যাবো।’
এসআই