সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে গিয়ে এবার মানতে হবে যেসব বিধিনিষেধ

  • জেলা প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১১:০৫ এএম
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে গিয়ে এবার মানতে হবে যেসব বিধিনিষেধ

টানা ৯ মাস বন্ধ থাকার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপটি ভ্রমণ করতে পারবেন। এবার প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে দ্বীপে রাতযাপনের বিষয়ে নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট কিছু না থাকায় পর্যটক, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও জাহাজমালিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পর্যটকদের সরকার নির্ধারিত ১২টি বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অনুমোদিত নৌযানে যাতায়াত, অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ, সৈকতে মোটরচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা এবং পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করবে। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। প্রত্যেক পর্যটককে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি হিসেবে ১০০ টাকা দিতে হবে।

মানতে হবে যেসব বিধিনিষেধ

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিএ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে চলাচল করতে পারবে না। পর্যটকদের বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।

দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি ও বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও করা যাবে না।

সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ দ্বীপের অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ মোটরচালিত যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। এ ছাড়া পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

রাতযাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি

সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াত নিয়ে গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়। সভায় ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটক যাতায়াতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত রোববার এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে পর্যটকদের রাতযাপনের বিষয়ে নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, দ্বীপে রাতযাপনের বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা আসেনি। আগের প্রজ্ঞাপনের শর্তগুলো বহাল রয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বুধবার কক্সবাজারে বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে প্রশাসনের কর্মকর্তা, পর্যটন করপোরেশন ও ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান, জাহাজমালিক, হোটেল-রেস্তোরাঁমালিক এবং ট্যুর অপারেটররা উপস্থিত থাকবেন। সবার মতামতের ভিত্তিতে রাতযাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক আরও জানান, সোমবার দুপুর পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে জাহাজ চলাচলের কোনো আবেদন জমা পড়েনি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজকে পর্যটক নিয়ে দ্বীপে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হবে না।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উদ্বেগ

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটক গেলে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ছেঁড়াদিয়ায় পর্যটক যাতায়াত বন্ধ রাখা, সৈকতের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চলাচল বন্ধ করা এবং নভেম্বর মাসে রাতযাপনের সুযোগ না দেওয়ার পক্ষে তিনি মত দেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, টানা ৯ মাস পর্যটক যাতায়াত বন্ধ থাকায় দ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশের উন্নতি হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে যাওয়া পর্যটকদের সরকার নির্ধারিত ১২টি বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।

গত বছরও সীমিত ছিল পর্যটক যাতায়াত

পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য গত বছর সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াত সীমিত করা হয়। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ওই মাসে পর্যটকেরা সেখানে যেতে পারেননি। নভেম্বরে রাতযাপনের সুযোগ ছিল না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাস পর্যটকেরা রাতযাপনের সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়া ও সেখানে রাতযাপনের সুযোগ পেয়েছিলেন।

চার বছর আগে টেকনাফ থেকে প্রতিদিন ৯ থেকে ১১টি জাহাজে পাঁচ থেকে ছয় হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিনে যেতেন। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, নাফ নদীতে বাংলাদেশি ট্রলার ও যাত্রীবাহী নৌযানে গুলিবর্ষণ এবং নৌকাসহ বাংলাদেশিদের অপহরণের ঘটনায় টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন পথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। দুই বছর ধরে কক্সবাজার থেকে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। পরে ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।

সেন্ট মার্টিনে সরকারি বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বন্ধ এবং পর্যটকেরা বিধিনিষেধ মানছেন কি না, তা তদারক করতে কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনে পৃথক দুটি দল কাজ করবে।

এম

Link copied!