পলাতক থেকেও নিয়মিত বেতন তুলেন অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম

  • লালমনিরহাট প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
পলাতক থেকেও নিয়মিত বেতন তুলেন অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম

ছবি : প্রতিনিধি

​লালমনিরহাট: প্রতিষ্ঠানে টানা প্রায় দুই বছর ধরে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম।

​তিনি লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক এবং জুলাই আন্দোলনের পর থেকে একাধিক হত্যা মামলার আসামি হয়ে বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

​জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনটি ‘তৃতীয় বিভাগ’ থাকা সত্ত্বেও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান শরওয়ার আলম। ​পরবর্তীতে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে ২০১২ সালে তিনি অধ্যক্ষ পদটি বাগিয়ে নেন। ​নিয়ম অনুযায়ী প্রভাষক থেকে অধ্যক্ষ হতে ১২ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন থাকলেও, মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি দলীয় ক্ষমতায় এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি দখল করেন।

​প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের অভিযোগ, দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ টাকার সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ করেছেন। ​বিগত সরকারের সময় তার এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। ​গত বছরের ২৮ আগস্ট তার নিয়োগ জালিয়াতি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর অভিযোগ দেন শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দ।

​তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তৎকালীন ইউএনও নূর-ই আলম সিদ্দিকী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। ​তবে নিয়ম অনুযায়ী তিন মাস পর বরখাস্তের মেয়াদ শেষ হলে তিনি পুনরায় পূর্ণ বেতন পেতে শুরু করেন। 

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হলে শরওয়ার আলম প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করে দেন। ​অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ‘উৎকোচ’ দিয়ে তিনি পলাতক থাকা অবস্থায় এখনো নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। ​
এদিকে অধ্যক্ষের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন, যার বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। ​চার বছরের সাজাপ্রাপ্ত ও বর্তমানে গ্রেপ্তার হওয়া সহকারী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা জামানকে নিয়মিত বেতন প্রদান করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ​এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের ইট ও খোয়া নিজের বাড়িতে পাচার এবং ফ্যান চুরির মামলা ও আপসের নামে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার নামে।

​সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে সেখানে কোনো চেইন অব কমান্ড নেই এবং শিক্ষকরা সময়সূচি মানছেন না। ​উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানায়, অধ্যক্ষ না এসেও বেতন পাচ্ছেন দেখে অন্য শিক্ষকরাও নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন না, প্রতিদিন মাত্র দুই থেকে তিনটি ক্লাস হয়।

​এদিকে একাধিক অভিভাবকরা জানান, শিক্ষকদের পাঠদানের দিকে কোনো নজর নেই, ফলে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটির সুনাম দিন দিন ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

এ বিষয়ে ​সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) তমিজার রহমান জানান, অধ্যক্ষ আন্দোলনের শুরু থেকেই অনুপস্থিত এবং তিনি কোথায় আছেন তা তাদের জানা নেই।

​ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইউএনওর নির্দেশে তিনি বেতনের কাগজে সই করেন এবং সরকার বেতন দেওয়ায় তিনি তা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

​প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার জানান, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেতনের শিট প্রস্তুত করে দিলে তিনি শুধু তা অনুমোদন করেন। ​তিনি আরও জানান, পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের জন্য একটি লিখিত আবেদন করেছেন, যা তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পিএস

Link copied!