অবসায়নের পথে পদ্মা ব্যাংক

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
অবসায়নের পথে পদ্মা ব্যাংক

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি থেকে বের হতে না পারায় পদ্মা ব্যাংক পিএলসি গুটিয়ে নেওয়ার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটি অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চলতি মাসেই বিষয়টি অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে তোলার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক হয়। সেখানে ব্যাংকটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলেও সংকট থেকে উত্তরণের কার্যকর কোনো পথ বের হয়নি। পরে ব্যাংকটি অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রস্তাবটি অনুমোদন করলে ব্যাংকিং রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ্মা ব্যাংক গুটিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এমনটি হলে দেশের ইতিহাসে এটি হবে কোনো ব্যাংক অবসায়নের প্রথম ঘটনা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা খেলাপি, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ। আগের বছরের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

ঋণ পুনঃতফসিল ও প্রস্থান কর্মসূচির আওতায় কিছু অর্থ আদায় হওয়ায় খেলাপি ঋণের হার সামান্য কমেছে। তবে ব্যাংকটির সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বিপুল খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান এখন পদ্মা ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়। এর আগে এক্সিম ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। ব্যাংকটি টিকিয়ে রাখতে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চেয়েছিল পদ্মা ব্যাংক। তবে সেই সহায়তার প্রস্তাবও বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রহণ করেনি।

পদ্মা ব্যাংকের সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন হিসাবে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ব্যাংকটির সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রতিবেদনে ব্যাংকটির মোট সম্পদ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পদ্মা ব্যাংকে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার বিপুল আমানত রয়েছে। প্রায় ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকটিতে আটকে আছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক, আইসিবি, জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বিটিআরসি, মোংলা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংকে জমা রয়েছে। এসব অর্থও বছরের পর বছর ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি।

২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা ফার্মার্স ব্যাংক মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সংকটে পড়ে। পরে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক করা হয়। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং আইসিবি মিলে ব্যাংকটিতে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়।

তবে এত সহায়তার পরও ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির সঞ্চিত লোকসান ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও কার্যকর হয়নি।

পদ্মা ব্যাংকের বর্তমানে ৬০টি শাখা, ১৪টি উপশাখা ও ৬টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে। ব্যাংকটিতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন।

পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান বলেন, ব্যাংকটির তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমানত ও মূলধন শেষ হয়ে গেছে। সঞ্চিত লোকসান ব্যাংকটির সম্পদ ও দায়ের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। এখন ঋণ আদায় ছাড়া কর্মকর্তাদের তেমন কোনো কাজ নেই।

তিনি বলেন, ব্যয় কমানোর জন্য ব্যবস্থাপনাকে অনেক আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তাতে কার্যকর ফল আসেনি। সরকারি নির্দেশে পদ্মা ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এখন ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকেই নিতে হবে।

এএইচ/পিএস

Link copied!