ছবি : প্রতিনিধি
ঢাকা: ডিজিটাল প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ পরামর্শ ও অস্বাভাবিক মুনাফার প্রলোভন থেকে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিনিয়োগ গ্রুপ, প্রতারণামূলক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, পরিচয় জালিয়াতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘ডিজিটাল ডেসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) যৌথ উদ্যোগে ডিএসই টাওয়ারের মাল্টিপারপাস হলে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার তানবীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব, নাফিজ আল তারিক ও হোসাইন সাদাত এবং ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের কর্মসূচি শেষ হলেও বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা ও সুরক্ষার কার্যক্রম সারা বছর অব্যাহত রাখতে হবে। পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ, লাইসেন্সপ্রাপ্ত মিউচুয়াল ফান্ড এজেন্ট ও আর্থিক পরামর্শক তৈরির উদ্যোগ, আইপিও নীতিমালা সংস্কার, ডাইরেক্ট লিস্টিং বিধিমালা এবং নতুন বিনিয়োগপণ্য চালুর বিষয়ে কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, বাজারের কার্যক্রম আধুনিকায়নে টি+১ সেটেলমেন্ট ও স্ক্রিপ নেটিং চালুর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজার আরও কার্যকর হবে এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের আগে তার আর্থিক বিবরণী, বিশেষ করে পরিচালন কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ করা জরুরি। শুধু মুনাফার অঙ্ক দেখে নয়, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা ও মৌলভিত্তি বিবেচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি এবং যাচাইহীন তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্যের যথার্থতা, প্রেক্ষাপট ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের শেখার সুযোগ তৈরি করা গেলেও সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর দায়িত্ব তাঁদের নিজেদের।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে ডিজিটাল প্রতারণা, ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও বিনিয়োগকারীদের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভুয়া পরিচয়, বিভ্রান্তিকর বিনিয়োগ পরামর্শ এবং রাতারাতি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের প্রতি তাঁদের আস্থাও হারাচ্ছেন।
মমিনুল ইসলাম জানান, এ ধরনের প্রতারণা মোকাবিলায় ডিএসই তার সার্ভেইল্যান্স ও মনিটরিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। বিএসইসির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও কার্যকর করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম জনসাধারণের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সুশাসন ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসইর আইসিটি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আবু নুর মোহাম্মদ হাসানুল করিম। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিনিয়োগ গ্রুপ, প্রতারণামূলক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, পরিচয় জালিয়াতি, ফিশিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করার বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, অবাস্তব মুনাফার প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার পাশাপাশি বিনিয়োগের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা ও পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা বজায় রাখতে ডিএসই, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিএসইসি কমিশনার নাফিজ আল তারিক আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বার্নি ম্যাডফের পঞ্জি স্কিমের উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রতারণামূলক বিনিয়োগ স্কিম সব সময় অস্বাভাবিক উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিচালিত হয় না। কখনো কখনো ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল মুনাফা দেখিয়েও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়।
তিনি বলেন, বাজারে ওঠানামা থাকা সত্ত্বেও কোনো বিনিয়োগে নিয়মিত ইতিবাচক রিটার্ন দেখানো হলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রকৃত উৎস যাচাই করা জরুরি। দ্রুত ও সহজে অধিক মুনাফা অর্জনের লোভ বিনিয়োগকারীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারে। তাই আবেগ ও লোভের পরিবর্তে তথ্য, বাস্তবতা ও যুক্তির ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিএসইসি কমিশনার নাহিদ মাহতাব বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও দাবি যাচাই না করে কোনো আর্থিক লেনদেন করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বুঝতে শুধু মুনাফার পরিমাণ দেখলে হবে না। পরিচালন কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট নগদ প্রবাহ, বিনিয়োগ কার্যক্রম এবং অর্থায়নসংক্রান্ত তথ্যও বিশ্লেষণ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জ্ঞান অর্জন ও তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বিএসইসি কমিশনার হোসাইন সাদাত বলেন, বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বার্থ সুরক্ষার একটি প্রতীকী উদ্যোগ। এর শিক্ষা শুধু এক সপ্তাহে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর চর্চা করতে হবে। পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জ্ঞান অর্জন এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফুর রহমান, এফসিএ; আইসিএসবির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহজাহান, এফসিএস; এবং সিএফএ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মাহতাব ওসমানি, সিএফএ।
সমাপনী বক্তব্যে ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বিক্রয়চাপ এড়াতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, পুঁজিবাজারে সহায়তার জন্য ব্যাংকগুলোর বিশেষ বিনিয়োগ তহবিলে আগে অনুমোদিত ২০০ কোটি টাকার সীমা বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে তিনি বিএসইসি চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানান।
আইপিওর আর্থিক বিবরণীর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, নতুন আইপিও বিধিমালার অপেক্ষায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ নিরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় দরকার। এ কারণে আর্থিক বিবরণীর মেয়াদ ১২০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৮০ দিন করা এবং নতুন আইপিও বিধিমালা কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে সাময়িক ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বক্তারা বলেন, ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধ, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
পিএস