ফাইল ছবি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান একজন চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ। কিন্তু এই মুহূর্তে সাদা দাঁড়ির শফিকুর রহমানের ছবিসমৃদ্ধ বিলবোর্ড ও পোস্টার ঢাকার সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে। যেগুলোতে বাংলাদেশের প্রথম ইসলামপন্থি সরকার গঠনের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাওয়া হচ্ছে। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০২৫-২০২৮ কার্যকালের জন্য পুনরায় তৃতীয় মেয়াদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত হন।
জামায়াতের প্রধান নেতা প্রায় ‘অখ্যাত’ অবস্থান থেকে এখন প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বিএনপির বিরুদ্ধে আসন্ন নির্বাচনে শক্তিশালী লড়াই করবে জামায়াতের প্রধান নেতা শফিকুর রহমান।
একটা সময় ছিল যখন জামায়াত ও বিএনপি একে অপরের সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করত। ২০২৪ সালে জেন-জি বিপ্লবের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, এক সময়কার নিষিদ্ধ দল জামায়াতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অভাবনীয় সাফল্যের পথে রয়েছে। তবে দলটির এই উত্থান উদারপন্থী নাগরিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে জামায়াতকে ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল; দলটির নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের কারারুদ্ধ করা হয় এবং ১৯৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এক পর্যায়ে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে তারা অনেকটা আত্মগোপনে চলে যায়। এই নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে ডা. শফিকুর রহমানকে আটক করা হয় এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিনি ১৫ মাস কারাভোগ করেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান জামায়াত এবং ডা. শফিকুর রহমানের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এতে জামায়াত আবারও সামনে আসার সুযোগ পায়।
জামায়াত এরপর দ্রুত নিজেদের সক্রিয় করে। তারা দাতব্য ও বন্যা দুর্গতদের জন্য কাজ শুরু করে। এর মধ্যে জামায়াত আমিরের সাদা দাঁড়ি ও সাদা পোশাক তাকে সবার মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান করে তোলে।
গত ডিসেম্বরে ডা. শফিকুর রহমান রয়টার্সকে বলেছিলেন, “আমরা আওয়াজ তোলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর আমরা আবারও সামনে আসার সুযোগ পেয়েছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে যে নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়েছিল, ডা. শফিকুর রহমান সেটিকে অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফি মোস্তফার ভাষায়, সেই অস্থির সময়ে প্রভাবশালী কোনো নেতার অনুপস্থিতিতে ডা. শফিকুর রহমান দেশজুড়ে ব্যাপক সফর এবং মিডিয়া কাভারেজের মাধ্যমে মাত্র দুই বছরেই নিজেকে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রাজনৈতিক কৌশল ও জোটবদ্ধতা
তিনি জামায়াতে ইসলামীকে একটি স্বচ্ছ, নীতিবান এবং ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবিত দল হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে, গত ডিসেম্বরে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘জেন-জি এনসিপি’-র সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে দলটি রক্ষণশীল গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ ও তরুণ ভোটারদের মাঝে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
দৃষ্টিভঙ্গি ও সমালোচনা
ডা. শফিকুর রহমানকে জামায়াতের একটি আধুনিক ও মধ্যপন্থী মুখ হিসেবে দেখা হয়। তিনি দুর্নীতি দমন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে তার কিছু অবস্থান নিয়ে বিতর্কও রয়েছে:
নারী নেতৃত্ব: নির্বাচনে কোনো নারীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তিনি সমালোচিত হয়েছেন।
কর্মঘণ্টা প্রস্তাব: নারীদের পরিবারের জন্য বেশি সময় দেওয়ার সুবিধার্থে পাঁচ ঘণ্টা কর্মদিবসের যে প্রস্তাব তিনি দিয়েছেন, তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
মূল দর্শন
নিজের আদর্শ ব্যাখ্যা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "জামায়াত একটি নমনীয় ও যুক্তিনির্ভর মধ্যপন্থী দল। তবে তাদের ভিত্তি কোরআন ও ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা তার মতে কেবল মুসলিমদের জন্য নয় বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের কল্যাণের জন্য।"
এসবিআর
আপনার মতামত লিখুন :