ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা: প্রায় দুই দশক লন্ডওনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফেরার দুই মাসও না পেরোতেই তারেক রহমান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। যেভাবে একসময় তার বাবা-মা দেশ শাসন করেছিলেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মতামত জরিপ ঠিক থাকলে, বৃহস্পতিবারের নির্বাচনটি ৬০ বছর বয়সী নরম-ভাষী এই নেতার জন্য এক অভাবনীয় ভাগ্য পরিবর্তনের সাক্ষী হবে। ২০০৮ সালে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আটক হয়ে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার প্রয়োজন দেখিয়ে তিনি দেশ ছেড়েছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্টে এক গণঅভ্যুত্থানে তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির (বিএনপি) প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন এবং পান বীরোচিত সংবর্ধনা।
বর্তমানে শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন। তিনি ও তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন এবং পরে নিহত হন।
তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব পুনর্গঠন করবেন যাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়, তবে দেশকে কোনো একক শক্তির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে না ফেলেন। এটি শেখ হাসিনার নীতির বিপরীত, যিনি ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত ছিলেন।
তিনি দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো শিল্প বিকাশের মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং স্বৈরাচারী প্রবণতা ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সীমা চালুর কথাও বলেছেন।
তার কার্ডিওলজিস্ট স্ত্রী ও ব্যারিস্টার কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় অবতরণের পর থেকে ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত এগিয়েছে যে, তিনি বলছেন, এসব নিয়ে ভাবারও সময় পাননি।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, “আমরা অবতরণের পর থেকে প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটেছে, আমি নিজেও জানি না”। তখন তার পাশে ছিলেন তার মেয়ে জাইমা, যিনি বাবার পক্ষে সমর্থন জোগাড়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
ইমেজ বদলের চেষ্টা
তারেক রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায়। তিনি খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বড় ছেলে। জিয়াউর রহমানই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করলেও তা অসম্পূর্ণ রেখে দেন এবং পরে বস্ত্র ও কৃষিপণ্য খাতে ব্যবসা শুরু করেন।
দেশে ফেরার পর থেকে তারেক রহমান নিজেকে এমন এক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন, যিনি শেখ হাসিনার শাসনামলে তার পরিবারের ভোগান্তির ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে প্রস্তুত। বিএনপির ২০০১–২০০৬ শাসনামলের ‘দাপুটে’ ভাবমূর্তি আর নেই। যদিও তিনি কখনো সরকারি পদে ছিলেন না, তবু সে সময় তার মায়ের সরকারের আড়ালে তিনি সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র পরিচালনা করতেন—এমন অভিযোগ ছিল, যা তিনি বরাবরই অস্বীকার করেছেন।
শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান একাধিক দুর্নীতি মামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হন এবং বেশ কয়েকটিতে অনুপস্থিত অবস্থায় দোষী সাব্যস্ত হন। ২০১৮ সালে, ২০০৪ সালে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে চালানো এক গ্রেনেড হামলার মামলায় তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং এগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি সব মামলায় খালাস পেয়েছেন।
লন্ডনে বসে তিনি দেখেছেন, একের পর এক নির্বাচনে তার দল প্রান্তিক হয়ে পড়ছে, জ্যেষ্ঠ নেতারা কারাবন্দী হচ্ছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হচ্ছেন এবং দলীয় কার্যালয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
দেশে ফেরার পর তারেক রহমান অনেকটাই সংযত ভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। তিনি উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে সংযম ও পুনর্মিলনের আহ্বান জানাচ্ছেন। “রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা” পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন—যা নতুন করে বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
তার ভাবমূর্তি নরম করতে বাড়তি ভূমিকা রেখেছে পরিবারের লোমশ সাইবেরিয়ান বিড়াল জেবু, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। “ওর বয়স সাত বছর। ও অর্ধেক সাইবেরিয়ান। আমরা ওকে দত্তক নিয়েছি,” রয়োটার্সকে বলেন তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা।
বিএনপির ভেতরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রার্থী নির্বাচন, কৌশল নির্ধারণ ও জোট আলোচনা—সবকিছুই তিনি সরাসরি তদারকি করছেন; কাজগুলো তিনি আগে লন্ডন থেকেই করতেন।
তিনি হয়তো রাজনীতির উত্তরাধিকারসূত্রে গড়ে ওঠা ধারার অংশ, কিন্তু তারেক রহমান বলছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও টিকিয়ে রাখাই হবে তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
“গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমেই আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি এবং আমাদের দেশকে পুনর্গঠন করতে পারি,” তিনি বলেন। “গণতন্ত্র চর্চা করলে আমরা জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে পারি। তাই আমরা গণতন্ত্র চর্চা করতে চাই, আমরা আমাদের দেশকে পুনর্গঠন করতে চাই।”
পিএস
আপনার মতামত লিখুন :