ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর দেশটিতে চীনের প্রভাব আরও জোরালো হতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, ঢাকায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেইজিংয়ের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আওয়ামী লীগের সময়ের মতো উষ্ণ ছিল না। অন্যদিকে, একই সময়ে চীন বাংলাদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা ও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
রয়টার্স জানায়, সম্প্রতি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি রাজনীতিক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। দূতাবাসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট অনুযায়ী, এসব আলোচনায় বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পসহ নানা কৌশলগত বিষয় উঠে এসেছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির রয়টার্সকে বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ ভারতের ভূমিকাকে শেখ হাসিনার দমনমূলক কর্মকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে দেখেন। জনগণ এমন কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক চান না, যারা সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয় বা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে সহায়তা করে।”
এর আগে তারেক রহমান নিজেও রয়টার্সকে বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়, তবে সেটি অবশ্যই জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ক্রীড়াক্ষেত্রেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর জেরে বাংলাদেশ আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করে এবং ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকেও বাদ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া দুই দেশ পরস্পরের নাগরিকদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বৈঠকও বিরল হয়ে উঠেছে। যদিও গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোক জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানে সহিংসতার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার চেষ্টা করলেও ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করেনি।
চীন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি।
শেখ হাসিনার পতনের পর চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বিপরীতে, আদানির মতো ভারতীয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি।
নিউ দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস’-এর সিনিয়র ফেলো কনস্টানটিনো জাভিয়ার রয়টার্সকে বলেন, “চীন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ্যে ও নীরবে বাংলাদেশে প্রভাব বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতিকে তারা কৌশলগতভাবে কাজে লাগাচ্ছে।”
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক থমাস কিন বলেন, “ঢাকা ও দিল্লি যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে না পারে, তাহলে পরবর্তী সরকার স্বাভাবিকভাবেই চীনের দিকে আরও ঝুঁকবে।”
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। সূত্র: রয়টার্স
এম
আপনার মতামত লিখুন :