ফাইল ছবি
আমাদের দল থেকে ৪৪টি আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন নারী। জোটের হিসাব-নিকাশ না থাকলে আরও বেশি আসনে প্রার্থী দেওয়া যেত।
বলছিলেন দিলশানা পারুল। ঢাকার অদূরে সাভার-আশুলিয়া নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৯ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির প্রার্থী তিনি। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন দিলশানা পারুল এনসিপির তিন নারী প্রার্থীর একজন।
এনসিপি মোট ৪৭টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে নারী প্রার্থী তিনজন, শতাংশের হিসাবে প্রায় সাত। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই হারই ব্যতিক্রম হিসেবে চোখে পড়ছে। কারণ দেশের অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দলে নারী প্রার্থীর হার আরও কম, অনেক দলে নেই বললেই চলে।
জামায়াতসহ ইসলামী ধারার অন্তত ৩০টি রাজনৈতিক দলে এবার একজন নারী প্রার্থীও নেই। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বাইরে প্রচলিত ধারার অনেক রাজনৈতিক দলও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে অনীহা দেখিয়েছে। ফলে বিপুল সংখ্যক নারী ভোটার থাকা সত্ত্বেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের বিপরীতে বিএনপি প্রথমে ১০ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। সংখ্যার হিসাবে এটিই ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সেই সংখ্যা নেমে আসে নয়জনে। শতকরা হারে বিএনপির নারী প্রার্থী মাত্র তিন শতাংশ।
দলটির ভেতরে কথা বলে নারী প্রার্থী কম হওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ উঠে এসেছে। নির্বাচনে জিতে আসার মতো নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম বলে ধারণা। মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী নারী নেত্রীর অভাব। আর মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় অর্থ, পেশিশক্তি ও কর্মীবাহিনীর ঘাটতি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এখানে নারী-পুরুষের প্রশ্ন নয়, জেতার সক্ষমতাই মূল বিষয়। যাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি, তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই গত দীর্ঘ সময় ধরে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করা যায়নি।
তবে দলটির ভেতর থেকেই সমালোচনাও আছে। বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নারী প্রার্থীরা তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব নন, বরং পুরুষ নেতাদের পরিবার থেকে আসা। এটিকে তিনি পুরুষ কোটায় নারী প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, সমস্যাটা ভোটারদের নয়, সমস্যাটা দলীয় রাজনীতির ভেতরেই বেশি। শেষ পর্যন্ত নারীরা সংরক্ষিত আসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যান।
ইসলামী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল জামায়াতে ইসলামী এবার ২৭৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে একজনও নারী নেই। অতীতেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি নারী প্রার্থী দেয়নি। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটেও একই চিত্র।
যদিও সংরক্ষিত নারী আসনে কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের নারী প্রতিনিধিত্বের নজির আছে। দলটির নারী শাখাও রয়েছে। তবু সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী না দেওয়ার পেছনে দলীয় নেতারা তিনটি যুক্তির কথা বলছেন। পর্দা মেনে গণসংযোগের বাস্তবতা, আগ্রহের ঘাটতি এবং নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, নারীদের প্রার্থী হতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে নির্বাচন মানে বড় দায়িত্ব। চলাফেরা, নিরাপত্তা ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নারীদের বাধ্য করা হয় না। পরিবেশ অনুকূল হলে নারীরাও আগ্রহী হবে।
বাস্তবতা হলো, নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলই এবার কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। মনোনয়ন ফরম তোলার ক্ষেত্রেও নারীর হার মাত্র চার শতাংশ। জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে যাওয়া অনেক প্রচলিত ধারার দলও নারী প্রার্থী দিতে পারেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, এটি হঠাৎ কোনো বিষয় নয়। দলগুলোর আদর্শিক ও কাঠামোগত জায়গা থেকেই নারীদের দূরে রাখার প্রবণতা আছে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী দেখা গেলেও জাতীয় সংসদে সেই আগ্রহ নেই।
তার মতে, পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার কাঠামো, মনোনয়ন বাণিজ্য, নির্বাচনি ব্যয়ের চাপ এবং সহিংস রাজনীতির আশঙ্কা নারীদের বড় বাধা। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক চাপও নারীদের পিছিয়ে দিচ্ছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যেকোনো মূল্যে জিততে চায় বলেই নারী প্রার্থী কম। দলগুলোর ধারণা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীদের জেতা কঠিন, আর তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও তুলনামূলক কম।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন আর ব্যক্তিগত যোগ্যতার নয়। প্রশ্নটা পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার। যে ব্যবস্থায় নারী ভোটার আছেন লাখে লাখে, কিন্তু প্রার্থী হিসেবে তাদের জায়গা এখনো প্রান্তেই।
এসএইচ
আপনার মতামত লিখুন :