• ঢাকা
  • সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০
সাক্ষাৎকারে ডিবিএ প্রেসিডেন্ট

পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনতে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগকারী আসবে না


আবদুল হাকিম  জানুয়ারি ২৫, ২০২৪, ০৮:১৮ পিএম
পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনতে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগকারী আসবে না

ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট ও ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের পরিচালক সাইফুল ইসলাম।

ঢাকা: শেয়াবাজারে বহু সমালোচিত ফ্লোর প্রাইসের (শেয়ার মূল্যের নিম্মসীমা) ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তুলে দিয়েছে ১২টি ব্যতিত সবগুলো কোম্পানির ফ্লোরপ্রাইস। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দিনে শেয়ারবাজারের উন্নয়ন, স্টক ব্রোকার, ডিলার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি বিধিমালা সংশোধনসহ বাজারের সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন পুঁজিবাজারে ব্রোকারদের একমাত্র সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট ও ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের পরিচালক সাইফুল ইসলাম।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সোনালীনিউজের স্টাফ রিপোর্টার আবদুল হাকিম।

সোনালীনিউজ: বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলেন?

সাইফুল ইসলাম: দীর্ঘ ১৮ মাস পর শেয়ারবাজার থেকে ফ্লোরপ্রাইস তুলে নেওয়া হয়েছে। এর আগে আমাদের শেয়ারবাজারে এমন দীর্ঘ সময় ফ্লোরপ্রাইস বা বিধি-নিষেধ ছিল না। এমন একটা পরিস্থিতিতে সবার মাঝে একটা শঙ্কা কাজ করছিল যে এখন ফ্লোরপ্রাইস তুলে নিলে বাজারে কি পরিস্থিতি তৈরি হবে? মার্কেটে বড় কিংবা ছোট বিনিয়োগকারীরা বাজারে এক্টিভ নেই ফ্লোরপ্রাইসের কারণে। আশার দিক হলো এতো শঙ্কার মধ্যেও ফ্লোরপ্রাইস তোলার পর বিনিয়োগকারীদের পজেটিভ রেসপন্স লক্ষ্য করা গেছে। যা হয়তো অনেকে আশা করেনি। প্রথম দিন খুব অল্প সমেয়র জন্য মার্কেটের সুচক কিছুটা মাইনাস ছিল। পরোক্ষণে স্বাভাবিক হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত একটা স্বস্তির আভাস পাওয়া গেছে।

আমরা হয়তো দিন শেষে দেখি ইনডেক্স কতটুকু কমেছে বা বেড়েছে কিন্তু আমাদের আরেকটা বিষয় দেখতে হবে কতটা ভলিউম বেড়েছে। সেটা দেখলে লক্ষ্য করবেন লেনদেনের ভলিউম কিন্তু ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ দেখতে হবে মার্কেটে বিনিয়োগকারী আছে কিনা। কেনা বেচা হচ্ছে কিনা। মার্কেটে বিনিয়োগকারী থাকলে অবশ্যই লেনদেন বাড়বে। মার্কেটের উপর যে বিশ্বাস আছে তার প্রমাণ হচ্ছে প্রতিদিন লেনদেনের ভলিউম বাড়ছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসবে কিনা, যে শঙ্কা ছিল সেটা কেটে গেছে। সুতারাং বাজারে ভালো শেয়ার আসলে বিনিয়োগকারী আসবে এতে সন্দেহ নেই। সবাইকে ভুল প্রামাণিত করে বিনিয়োগকারীরা জানান দিয়েছে বাজারে আস্তার সংকট নেই। এখন দেখার বিষয় আমাদের বাজারে প্রোডাক্ট কেমন দিতে পারছে। নতুন প্রোডাক্ট থাকলে বাজারে বিনিয়োগকারী সরব পাওয়া যাবে।

বাজারে বিনিয়োগকারীর সংকট নেই তার আরেকটি উদাহরণ হলো, বাজারে কোন আইপিও আসলে তার যে সাবক্রিপশন চলাকালীন তা ফিলআপ হয়ে যায়।

সোনালীনিউজ: ১২টি কোম্পানির ফ্লোরপ্রাইস বহাল রাখার কারণ কি হতে পারে?

সাইফুল ইসলাম: দীর্ঘ সময় যেহেতু ফ্লোরপ্রাইস বহাল ছিল। হঠাৎ করে হয়তো সবগুলো তুলে নেওয়াটা যুক্তিসংগত মনে করেনি রেগুলেটরি সংস্থা। এমনটা হতেই পারে কারণ দীর্ঘ সময় যেহেতু কোন ক্রয়-বিক্রয় হয়নি বললে চলে। সেখানে হঠাৎ করে একটা বিষয় যখন পুনরায় চালু করা হয়, একটু রিস্ক থাকে। এমন রিস্ক মাথায় রেখেই হয়তো রেগুলেটরি সংস্থা ধারাবাহিকভাবে ফ্লোরপ্রাইস তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা কিছুটা জানতাম ধাপে ধাপে ফ্লোরপ্রাইস তুলে দিবে, কিন্তু কখন কিভাবে দিবে সেটা জানতাম না। তবে প্রথম সিদ্ধান্তে ৩৫টি ছাড়া সবগুলো তুলে দিয়েছিল এরপর আরও ২৩টা তুলে দিয়েছে। এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় হতেই পারে। কমিশন সার্বিক দিক পর্যবেক্ষণ করেই এমনটা করেছেন। কোন সিদ্ধান্ত নিতে মার্কেট প্রস্তুত কিনা ভেবে দেখার এমন কিছু বিষয় থাকে, কিছু কোম্পানি আছে যাদের মূলধন বেশি সেগুলো হয়তো মার্কেটের বড় প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হতে পারে। সব বিবেচনায় ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তবে যে ১২টি কোম্পানির ফ্লোরপ্রাইস বহাল আছে সেগুলোও হয়তে কিছু দিনের মধ্যে তুলে দিবে।

সোনালীনিউজ: শেয়ারবাজারে স্টক ব্রোকার, ডিলার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি বিধিমালা সংশোধনের প্রক্রিয়া চলমান এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?

সাইফুল ইসলাম: আমরা নীতিমালার ভারে জর্জরিত। আমাদের এখানে ব্যবসা যা হয় তার চেয়ে নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয় বেশি। আমরা সব সময় বলেছি আগে মার্কেটটা বড় করেন। আমরা সবাই একত্রে মার্কেট সাইজ বড় করতে কাজ করি। কয়েকদিন পর পর যদি রুলস রেগুলেসন আসে, সেটা মেনে চলা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দায়িত্বে যেই আসুক যারা স্টেইক হোল্ডার তাদের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন। আপনি একটা আইন কার্যকর করবেন কিন্তু সেটা নিয়ে কোন আলোচনা করবেন না। এমনটা হলে তো চাপিয়ে দেওয়া আইন হয়। বিএসইসি তো আমাদের রেগুলেট করার জন্য আছেন। আমরাও আপনাদের আইন কানুনের মধ্যেই ব্যবসা করতে চাচ্ছি, সেবা দিতে চাচ্ছি। এখন কোন নতুন আইন আসার আগে সেটা নিয়ে যদি কোন আলোচনার আয়োজন না হয়, এটা কোন সঠিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। যে সমস্ত আইন তৈরি করা হচ্ছে এগুলো মার্কেট উপযোগি না। আমাদের কথা হচ্ছে বাজারে উন্নয়নে যেসব আইন আসবে সেটা মার্কেট উপযোগি হতে হবে। এগুলো কতটুকু উপযোগি, এগুলো এপ্লাই করা যাবে কিনা অথবা এগুলোর কোন দকারা আছে কিনা না? এসব বিষয়গুলো যাছাই করতে হবে। এমন কিছু বিষয় আছে যেখানে রেগুলেটরদের আসার দরকার নাই সেখানেও তারা ঢুকতে চাচ্ছে এতে করে তাদেরও তো সময় নষ্ট হচ্ছে।

সুতরাং বিএসইসির পক্ষ থেকে যাই করা হয় তা আমারা (ডিবিএ) বা ডিএসইকে নিয়ে আলোপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যতদিন নতুন নিয়ম কানুনের ব্যাপারে উভয় পক্ষ বসে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, ততদিন যেন আমাদের উপর কোন ধরনের নতুন আইন প্রয়োগ না করে তা আমাদের প্রত্যাশা। কারণ এসব নিয়ম চলমান কাজে অনেক ধরণের প্রভাব পড়ে। অন্যতম কারণ রেগুলেটর যখন কোন নিয়ম প্রয়োগ করে তা মানতে আমরা বাধ্য, কিন্তু সেটা যদি সময় কিংবা মার্কেট উপযোগী না হয় তাহলেই একটা বাড়তি পেসার পড়ে স্বাভাবিক কাজে। যা সার্বিকভাবে বড় ধরণের ব্যাঘাত হয় বলে মনে করছি।

সোনালীনিউজ: বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ট্রেকহোল্ডার বা ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ন্যূনতম মূলধন বাড়ানোর বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?

সাইফুল ইসলাম: ব্রোকার হাউজের কাজ হলো যে শেয়ার কিনবে সে টাকা দিবে। আর যে শেয়ার বিক্রি করবে সে শেয়ার দিবে। আমি (ব্রোকার হাউজ) এটা মার্কেটে ক্রয় বা বিক্রয় করব। আমার কাজ হচ্ছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা। এই কাজটা করতে গিয়ে আমাকে মিনিমাম একটা ক্যাটিপটাল রাখতে হয়, যাতে অপারেশনে টাকার সংকট থাকলে সেটা সমাধানে একটা ক্যাপিটাল রাখতে হয়। সেটাই আমার জন্য পেইড অফ ক্যাপিটাল যা আমাকে রাখতে হয়। এখন আপনি যদি আমাকে বড় ধরণের এমাউন্ট ক্যাপিটাল হিসেবে রাখতে বলেন, যেটা ব্যবসার জন্য বড় একটা ফ্যাক্ট কারণ সেখান থেকে আমি রিটার্ন পাচ্ছি না। এমন একটি বিষয় চাপিয়ে দেওয়া মানে আমাকে ব্যবসায় ফোর্স করা বা ব্যবসা থেকে বের করে দেওয়ার মত। যা কখনো ফেয়ার হতে পারে না। বাজার পরিস্থিতি বা আমার ব্যবসার সাইজ অনুযায়ি আপনি আমাকে ক্যাপিটাল রাখতে বলতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি আমাকে বড় সাইজের ক্যাপিটাল আনতে বলেন যেটার রিটার্ন শূণ্য তার মানে আমার ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। সুতারাং যাই নিয়ম করা তা যদি উভয় পক্ষের পরামর্শ নিয়ে করলে সবার জন্য উপযোগী হবে। এজন্য আমরা বলেছি নতুন আইন বাস্তবায়নে আরও সময় প্রয়োজন।

সোনালীনিউজ: বাজারে ভালো কোম্পানি না আসার কারণ কি বলে আপনি মনে করছেন?

সাইফুল ইসলাম: আমাদের বাজারে ভালো কোম্পানি না আসার কারণ জানতে অবশ্যই পুরো প্রসেসটা রিভিউ করতে হবে। শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি আসা বন্ধ হয়ে গেলে তো মার্কেট এখানেই থেমে যাবে, বড় হবে না। আমাদের টার্গেট হচ্ছে মার্কেট বড় করা কিন্তু যে রেশিওতে মার্কেট বড় হওয়ার কথা, সে অনুযায়ী হচ্ছে না। এক কথায় বলা যায় আমাদের দেশের অর্থনীতি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সেভাবে শেয়ারবাজারের সাইজ বড় হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে নতুন আইপিও আসছে না। নতুন আইপিও কেন আসছে না এটা জানতে ওপেন মাইন্ডে এটা রিভিউ করতে হবে। মার্কেটে ভালো এবং বড় কোম্পানি না আসার কারণটা ঠিক বের করতে না পারলে সমাধানে কাজ করা সম্ভব না। বিগত দিন যদি দেখি বাজারে নাম মাত্র ছোট কোম্পানি আইপিওতে আসছে। এভাবে মার্কেটে বিনিয়োগকারী ধরে রাখা বা নতুন বিনিয়োগকারীদের মার্কেটে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ভালো প্রোডাক্ট না থাকলে বাজারে ক্রেতা বা বিনিয়োগকারী আসা করা ভুল হবে। তেমনি ভালো কোম্পানি আনতে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগকারী আসবে না।

এবার আসি কেন ভালো কোম্পানি বাজারে আসছে না। একটা কোম্পানি বাজারে আসতে যে আইন কানুনের মধ্যে দিয়ে আসতে হয় সেটা হয়তো বড় কোম্পানিগুলোর জন্য অনেক সময়ের ব্যাপার। তবে আমি বলছি না আইন কানুন বাদ দিয়ে আনা হোক। আমার ধারণা নিয়ম কানুন কিছুটা সহজ করা যায় কিনা সেটা বিবেচনা করা যায়? এটা যত দ্রুত করা যাবে ততই ভালো। এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষনীয় যে তালিকাভুক্ত এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর ব্যবধানটা যদি বাড়ানো হয় তাহলেও কিছুটা সম্ভাবনা থাকে বাজারে নতুন কোম্পানি আসা। এখানে কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় যদি একটু ছাড় দেওয়া হয়। এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে ইনসেন্টিভ দেওয়া। তবে দেখা যাবে তালিকাভুক্তির পর এদের থেকে ট্যাক্স আহরণের সুযোগ থাকছে, এবং সেটা নিয়মের মধ্যেই তারা দিতে বাধ্য। এজন্য শুরুটা সহজ পদ্ধতিতে আনার একটা উদ্যোগ খুবই দরকার।

সোনালীনিউজ: বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে যদি কিছু বলেন..

সাইফুল ইসলাম: বিনিয়োগকারীদের বলবো টাকা আপনার, বিনিয়োগও করবেন আপনি, তবে দেখে শুনে এবং বুঝে সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করুন। ইনডেক্স কোথায় যাচ্ছে বা কে কি বলছে এসব থেকে বের হয়ে আপনি দেখেন আপনি কোথায় বিনিয়োগ করছেন। আপনার টাকাটা কোথায় রাখছেন। আপনার টাকা যেমন খারাপ ব্যাংকে রাখতে চাইবেন না হারানোর ভয়ে ঠিক তেমনি শেয়ারবাজারেও খারাপ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবেন না। আপনাকে দেখতে হবে বিনিয়োগ করা কোম্পানির কোয়ালিটি কেমন এবং রিসার্স করুণ কোম্পানিটি বিগত দিনের পারফরমেন্স সম্পর্কে। কারো কথায় কান দিবেন না, গুজব থেকে দুরে থাকুন। নিজে শেয়ারবাজার সম্পর্কে না বুঝলে ভালো একজন পরামর্শক খুঁজে নেন। মনে রাখবেন টাকা আপনার, লাভ আপনার এবং লসও আপনার। সুতারাং সিদ্ধান্তও আপনাকেই নিতে হবে।

ওয়াইএ

Wordbridge School
Link copied!