পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন স্থানে ভেসে আসছে বিপুল পরিমাণ মৃত জেলিফিশ। সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তিন নদীর মোহনা, চর বিজয়, গঙ্গামতির চর, লেবুর বন, কাউয়ার চর, ফাতরার বনসহ সৈকতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শত শত মৃত জেলিফিশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর আগেও গত জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়েক দিন ধরে কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকায় সাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জেলিফিশ ভেসে এসেছিল। তবে এত বড় আকারে ও এত সংখ্যায় জেলিফিশের মৃত্যু কেন হচ্ছে—তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো কারণ জানা যায়নি।
পরিবেশ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গভীর সাগরে মাছ ধরার ট্রলার ও মা-চিংড়ি ধরার ট্রলিং জাহাজের জালে আটকা পড়ে বিপুল পরিমাণ জেলিফিশ মারা যেতে পারে। মৃত্যুর পর জোয়ারের পানির সঙ্গে সেগুলো উপকূল ও সৈকতে ভেসে আসছে। এছাড়া সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার তারতম্য ও অক্সিজেনের ঘাটতিও জেলিফিশের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে জেলেদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, সাগরের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় এবং বয়সের ভারে স্রোতের বিপরীতে চলতে না পেরে অনেক জেলিফিশ মারা যাচ্ছে।
স্থানীয় জেলে রহমান মাঝি বলেন, “আমরা এখন বেশি গভীর সমুদ্রে যাই না, কাছাকাছি এলাকা থেকেই মাছ শিকার করছি। কিন্তু জেলিফিশের পরিমাণ এত বেশি যে জাল ফেলা ও তোলা খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে জাল ফেলে কিনারায় চলে আসতে হবে বলে মনে হচ্ছে।
আরেক জেলে হেলাল জানান, “জাল তুললেই প্রচুর মৃত জেলিফিশ উঠে আসে। এতে আমাদের হাত-পা জ্বালা করছে, জালেরও ক্ষতি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, তেমন মাছও পাওয়া যাচ্ছে না।”
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (উপরা) আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু বলেন, অপরিকল্পিত ট্রলিং, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণেই এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
কুয়াকাটার ডলফিন রক্ষা কমিটির সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, জেলিফিশ সামুদ্রিক খাদ্যচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের অস্বাভাবিক মৃত্যু ডলফিনসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, বলেন, “সমুদ্রে অতিরিক্ত ট্রলিং, জালের ঘর্ষণ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে জেলিফিশের মৃত্যু হতে পারে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। প্রয়োজনে সাগরে জরিপ চালিয়ে প্রকৃত কারণ নির্ণয় ও করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
ড. মো. সাইফুল ইসলাম সহযোগী অধ্যাপক ও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান গবেষক মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংক্ষেপে বলেন, “এটি স্বাভাবিক নয়—জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের কর্মকাণ্ড মিলেই জেলিফিশের এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।”
এদিকে, সৈকতে ভেসে আসা মৃত জেলিফিশের কারণে পর্যটকদের মাঝেও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কুয়াকাটার সামুদ্রিক পরিবেশ ও পর্যটন খাত উভয়ই ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এম
আপনার মতামত লিখুন :