ছবি : প্রতিনিধি
লালমনিরহাট: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর প্রথমবার নিজ নির্বাচনী এলাকা লালমনিরহাটে পা রেখেছেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। তাকে বরণ করতে পুরো জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করলেও, ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের নির্ধারিত সরকারি কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী মন্ত্রীর জন্য পৃথক পুষ্পস্তবকের ব্যবস্থা না থাকায় উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি হয়।
মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরিত পূর্বনির্ধারিত সরকারি সফরসূচি (শিডিউল) অনুযায়ী, শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ১২:০১ মিনিটে লালমনিরহাট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের কথা ছিল মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সফরের সার্বিক নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিকতার সকল ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের ওপর অর্পিত থাকে। তবে নির্ধারিত সময়ে মন্ত্রী শহীদ মিনারে উপস্থিত হলেও সেখানে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। মন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পৃথক পুষ্পস্তবকের (রেথ) ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এসময় মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাটের ডিসিকে বলেন ” আমার পুষ্পস্তবক কই? আমি তো প্রশাসনিক কোন লোক না।” মন্ত্রীর পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক না থাকায় তিনি বিষয়টি নিয়ে বিব্রত প্রকাশ করেন। এমনকি শহীদদের স্মরণে এক মিনিটের নীরবতা পালন কিংবা মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিলের কোনো আয়োজনও ছিল না সেখানে।
জেলা প্রশাসনের এমন উদাসীনতায় এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিচক্ষণতার সাথে সামাল দেন মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে উপস্থিত জেলা বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান তিনি। উপস্থিত অনেকে এই ঘটনাকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ‘প্রটোকল লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাজুল চৌধুরী জানান, সরকারি প্রটোকল অনুযায়ী মন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের সকল আয়োজন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করার কথা থাকলেও তারা উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে শুধু মন্ত্রী নন আমাদেরকেও বিব্রত অবস্থায় ফেলেছেন।
সাংস্কৃতিক সংগঠক শামীম আহমেদ জানান, লালমনিরহাট জেলা প্রশাসনের এমন সমন্বয়হীনতা সাধারণত ‘প্রটোকল লঙ্ঘন’ হিসেবে বিবেচিত।
লালমনিরহাট জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আনিছুর রহমান ভিপি আনিছ জানান, সরকারি প্রটোকল অনুযায়ী মন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করবেন জেলা প্রশাসন। কিন্তু তারা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে শহীদ মিনারে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও নেতা-কর্মীর মধ্যে ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। এটা কেন হলো তা ক্ষতিয়ে দেখা হবে বলেও তিনি জানান।
এদিকে একুশের প্রভাত ফেরি (সূর্য উদয়) থেকে লালমনিরহাট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় মাইকে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি বাজানো হয়নি। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত শহীদ মিনারের সকল মাইক বন্ধ ছিলো। এসময় শহীদ বেদীতে বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষজন পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্যদিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
এ ঘটনা লালমনিরহাট সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এবং টিআইবি সদস্যবৃন্দ শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদ দিবসের ওই গানটি সমবেত কন্ঠে গেয়ে প্রতিবাদ জানায়। এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার মুখে পড়েন জেলা প্রশাসন। পরে তড়িঘড়ি করে জেলা তথ্য অফিসের মাইক নিয়ে সকাল ১০টার দিকে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি বাজানো শুরু করা হয়।
এইসব বিষয়ে জানতে চাইলে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) এইচ এম রকিব হায়দার বিষয়টি কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “মাননীয় মন্ত্রী হচ্ছেন সরকার, তাই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেই ফুল দেওয়া হয়েছে।” তবে সরকারি প্রটোকল অনুযায়ী মন্ত্রীর জন্য কেন পৃথক ব্যবস্থা বা আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
পিএস
আপনার মতামত লিখুন :