ছবি : সোনালীনিউজ
ঢাকা: সম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে এখন পর্যন্ত দেশের কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। তবে জ্বালানি সংকটের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টম্বর) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এসব কথা বলেন। ‘বাটেক্সপো ২০২৬’, হংকং রোডশো এবং পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই মাসে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি। তবে এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। আগামী তিন থেকে চার মাস পর পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, একটি পোশাক কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত একদিনে নেওয়া হয় না। কারখানায় থাকা অর্ডার শেষ করা, শ্রমিকদের আইনগত পাওনা পরিশোধ এবং ব্যাংকের দায়দেনাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়। এ কারণে কোনো কারখানা বন্ধ করতে প্রায় ছয় মাসের পরিকল্পনা প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় ডাইং, ওয়াশিংসহ পোশাকশিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কারখানাকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বেশি সময় ব্যয় করতে হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে পোশাক কারখানাগুলো দিনে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করে। জ্বালানি সংকটের মধ্যেও সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠানোর চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তারা বলে জানান বিজিএমইএ সভাপতি।
গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি
গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে বিজিএমইএ। এ বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছে।
বিজিএমইএর ধারণা, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি সংকটের বড় ধরনের সমাধান সম্ভব হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক গ্যাস সংরক্ষণ অবকাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি। তাঁর মতে, শুধু এফএসআরইউ বাড়ালেই হবে না; গ্যাস বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
এ ছাড়া এসএমই কারখানায় গ্যাস সংযোগ ও রেশনিংয়ে অগ্রাধিকার, ১০০ থেকে ৫০০ পিএসআই বয়লারসম্পন্ন কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে কম সুদের ‘গ্রিন লোন’ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ।
সৌরবিদ্যুতে জোর
পোশাকশিল্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি জানান, তিনি ২০১৯ সাল থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের কথাও জানান তিনি।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সদস্য কারখানাগুলোতে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। তবে বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি রিটার্ন ও উচ্চ সুদের হার এ ক্ষেত্রে বড় বাধা। এ কারণে কম সুদের গ্রিন ফাইন্যান্সের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় চায় পোশাক খাত
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময় তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি বলেন, অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতির সুযোগ বাড়বে।
এ লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া এলডিসি উত্তরণের পর পোশাক রপ্তানির বাজার ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার ওপর গুরুত্ব দেন বিজিএমইএ সভাপতি। তাঁর মতে, জিএসপি প্লাসের পাশাপাশি এফটিএ নিয়েও আলোচনা এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
নতুন বাজারে নজর
পোশাক রপ্তানির বাজার বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে নতুন দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার বাইরে অন্যান্য বাজার থেকে আসে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার।
হংকংয়ে অনুষ্ঠেয় একটি রোডশোতে নতুন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে ‘জাপান ডেস্ক’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিজিএমইএ।
সংগঠনটির লক্ষ্য, বর্তমানে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের জাপানমুখী পোশাক রপ্তানি ভবিষ্যতে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা।
এসআই