ফাইল ছবি
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ঘিরে তৈরি হওয়া চলমান অস্থিরতা এখন আর কেবল একটি একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং তা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির শীর্ষ পদে আকস্মিক রদবদল, আমানত তোলার হিড়িক এবং তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
ব্যাংক খাতের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন স্পষ্ট করেই বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়ছে। এ কারণে সাধারণ ব্যাংকাররা বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক ব্যাংকার্স সভায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা তাঁদের এই উদ্বেগের কথা জানান। সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা (এমডি) আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকটিতে এমন অস্থিরতা চলতে থাকলে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কোনো একটি ব্যাংকের ওপর থেকে আস্থা উঠে গেলে তার ধাক্কা পুরো ব্যাংক খাতকেই সইতে হয়।
এই অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের ঘটনাকে। ঈদের ছুটির ঠিক আগে সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে এই পদে বসানোর পর থেকেই ব্যাংকটির অভ্যন্তরে ও বাইরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপের বিপুল পরিমাণ ঋণ জালিয়াতিতে প্রচ্ছন্ন সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে দেশের বৃহত্তম ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক দেখা দেয়। যার ফলে জুনের প্রথম সপ্তাহেই ব্যাংকটি থেকে চার হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়া হয়। নগদ অর্থের এই সংকট সামাল দিতে ইসলামী ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে বিষয়টির রাজনৈতিকীকরণের কারণে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানও স্বীকার করেছেন যে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান পরিস্থিতি এখন আর কেবল ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকটির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির এই বিতর্কিত চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিতে ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি জামায়াতও মাঠে নেমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংক হলো দেশের ব্যাংক খাতের এক বিশাল স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি যদি কোনো কারণে দুর্বল বা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তবে পুরো ব্যাংকিং শিল্পেই বড় ধস নামতে পারে। ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনতে গভর্নর ব্যাংক নির্বাহীদের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানালেও ইসলামী ব্যাংকের চলমান সংকট নিরসনে এখনো কোনো জাদুকরি সমাধান মেলেনি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে দ্রুত একটি যৌক্তিক সমঝোতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এই অশনিসংকেত অচিরেই দেশের পুরো অর্থনীতিকে গ্রাস করতে পারে বলে মনে করছেন খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা।
এসএইচ
আপনার মতামত লিখুন :