প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা মূল্যায়নে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা

  • সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা মূল্যায়নে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা

ফাইল ছবি

ঢাকা: দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি নিরূপণে ‘ধারাবাহিক মূল্যায়নে’র পাশাপাশি ‘সামষ্টিক মূল্যায়ন’ বা লিখিত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হতে যাচ্ছে, যা চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নতুন প্রণীত ‘মূল্যায়ন পদ্ধতি, ২০২৬’- এর খসড়া অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এই নির্দেশিকাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। 

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (বিদ্যালয়) রেবেকা সুলতানা জানান, প্রাথমিকের জন্য এনসিটিবি প্রণীত খসড়া মূল্যায়ন পদ্ধতি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আগামী ১৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার একটি বিশেষ পর্যালোচনা সভা আহ্বান করা হয়েছে। তিনি বলেন, সভাটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা এবং সচিবের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে, চলতি বছর থেকে নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করা হবে কি না।

এনসিটিবি প্রণীত নতুন ‘মূল্যায়ন’ নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথাগত লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি খুদে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিটি বিষয়ে বাধ্যতামূলক মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। একই সাথে, পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে পাসের জন্য ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে পাস নম্বর ৩৩ শতাংশ করা হয়েছে।  

শিক্ষার্থীকে প্রতি প্রান্তিকে মোট ৮৫ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি থাকতে হবে। আর প্রতি প্রান্তিকের সামষ্টিক পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থতাজনিত/অনিবার্য কারণে কোনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারলে, শিক্ষার্থীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন প্রশ্নপত্রে বিকল্প পরীক্ষা গ্রহণ করবে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, ফলাফল ও শিখন অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরিতে মূল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণ, শিখন অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। 

গত ২১ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক পত্রে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন ও নির্দেশনা জারির অনুরোধ জানিয়েছে এনসিটিবি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ, পিটিআই ইনস্ট্রাক্টর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সুনির্দিষ্ট মতামতের ভিত্তিতে এই নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

এনসিটিবি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে আমরা একটি সমন্বিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা পাঠিয়েছি। তবে-এ বিষয়ে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা জারি করবে, আমরা শুধু বাস্তবায়ন করবো।’ 

তিনি জানান, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। আমরা শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে একটি ‘সমন্বিত মূল্যায়ন’ নির্দেশিকা তৈরি করেছি। এখন মন্ত্রণালয় একটি সভা ডেকে নির্দেশিকাটি অনুমোদন করবে।  

মূল্যায়নে ফিরছে পরীক্ষা ও নম্বর বিভাজনে যা থাকছে :

খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রাথমিক স্তরে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির মূল্যায়নে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগে এই স্তরে শুধু শ্রেণি কার্যক্রমের ওপর জোর দেওয়া হলেও, এখন থেকে আনুষ্ঠানিক লিখিত পরীক্ষা বা সামষ্টিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করার প্রস্তাব করেছে এনসিটিবি। 

প্রস্তাবনায় শ্রেণিভিত্তিক নম্বরের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে ৫০ নম্বরের এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির হবে ৩০ নম্বরের। অন্যদিকে প্রতি প্রান্তিকে একবার সামষ্টিক মূল্যায়ন করতে হবে। এই মূল্যায়নের নম্বর হবে ৭০ করে। 

প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নম্বর বিভাজনের ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। এর মধ্যে ৫০ নম্বর থাকবে ধারাবাহিক মূল্যায়নে (সারা বছরের পারফরমেন্স) এবং বাকি ৫০ নম্বর থাকবে সামষ্টিক মূল্যায়নে (লিখিত ও মৌখিক)। এই দুই শ্রেণির অন্যান্য বিষয়ে (চার বিষয়) ৫০ নম্বরের মধ্যে ২৫ নম্বর ধারাবাহিক ও ২৫ নম্বর সামষ্টিক মূল্যায়নে বরাদ্দ করা হয়েছে। 

এনসিটিবি জানিয়েছে, যে-সকল বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তক পেয়ে থাকে,  সে-সকল বিষয়ে মোট ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন হবে। যে-সকল বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক নেই, সে-সকল বিষয়ে ৫০ নম্বরের মূল্যায়ন হবে।  

অন্যদিকে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩০ নম্বর থাকবে ধারাবাহিক মূল্যায়নে। আর ৭০ নম্বর থাকবে সামষ্টিক মূল্যায়নে। এই ৭০ নম্বরের মধ্যে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে হবে। এছাড়া শিল্পকলা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে ৫০ নম্বরের মধ্যে ধারাবাহিক ১৫ এবং সামষ্টিক মূল্যায়নে ৩৫ নম্বর রাখা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, নির্দেশিকাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। এ সপ্তাহেই মন্ত্রণালয়ে এটি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, ‘সামনে যেহেতু জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নতুন সরকারের কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম নিয়ে ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হলে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে করতে হয়। তাই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর আগে সব দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

মহাপরিচালক জানান, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেণি কার্যক্রমসহ কিছু কিছু মূল্যায়ন পদ্ধতি চলমান রয়েছে। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করার আগে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়েই শুরু করতে হবে।

নতুন পদ্ধতিতে যা থাকছে : 

প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রতি শিক্ষাবর্ষে তিনটি প্রান্তিকে (টার্ম) মূল্যায়ন সম্পন্ন হবে। পাঠ্য পুস্তকের কাজ, শ্রেণি কাজে সক্রিয়তা এবং নিয়মিত ক্লাস টেস্টের মাধ্যমে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে; লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি পারফরমেন্স যাচাইয়ে মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া হবে; পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম ৮৫ শতাংশ উপস্থিতি এবং গড়ে ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। 

ফলাফল প্রকাশ করা হবে ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’-এই চারটি গ্রেডে। অর্থাৎ অতি উত্তম, উত্তম, সন্তোষজনক, সহায়তা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে যারা শূন্য থেকে ৩৯ নম্বর পাবে-তাদের গ্রেড হবে ‘ঘ’। মানে এ সংখ্যক শিক্ষার্থীর মানোন্নয়নে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সূত্র : বাসস।

পিএস

Link copied!