বিলুপ্তির পথে মোরেলগঞ্জের ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ি

  • মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৬, ০৬:৪২ পিএম
বিলুপ্তির পথে মোরেলগঞ্জের ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ি

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের ঐতিহাসিক নিদর্শন কুঠিবাড়ী আজ বিলুপ্তির পথে। পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা রহস্য ও ইতিহাসের সাক্ষী কুঠিবাড়ীর এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সুন্দরবনের সঙ্গে সরাসরি স্থলপথে যোগাযোগের সুযোগ থাকা এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন কুঠিবাড়ীর রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার অপার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রত্ত্বতত্ত্ব বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে পিছিয়ে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী এই জনপদ। 

জানা গেছে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবকে দমন করে ইংরেজ শাসকরা এদেশে তাদের শাসন দৃঢ় করার লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে তার মধ্যে কুঠিভিত্তিক শাসনব্যবস্থা অন্যতম। এই শাসনব্যবস্থাকে সুদূর সুন্দরবনাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করার লক্ষ্যে পানগুছি নদীর পশ্চিম তীরে সরালিয়া খালের দক্ষিণ পাশে গড়ে ওঠে একটি কেন্দ্র। এছাড়া সুন্দরবনের আরও কিছু এলাকা আবাদ করে ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে তার সীমানা নির্ধারণ করে চব্বিশ পরগণার জমিদার কাশিনাথ মুন্সির কাছে পত্তন দেয়া হয়। কাশিনাথ মুন্সির কাছ থেকে বারইখালী এলাকার পত্তনি গ্রহণ করেন কৃষক নেতা জাহাঙ্গীর। এরই মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি মি. মোরেলের মৃত্যু হলে তার স্ত্রী মিসেস মোরেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে ধরনা দিয়ে সরালিয়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ওপর কর্তৃত্ব দাবি করেন। কাশিনাথ মুন্সি দয়াপরবশ হয়ে নিজের অধিকার প্রত্যাহার করলে মিসেস মোরেল তার দুই ছেলের নামে এ অঞ্চলের পত্তনি গ্রহণ করেন। তারা পানগুছি নদীর পশ্চিম তীরে বন আবাদ করে গড়ে তোলে আবাসস্থল ‘কুঠিবাড়ী’। নির্মিত হয় আস্তাবল, পিলখানা, নাচঘর, গুদামঘর, কাচারিবাড়ি, নির্যাতন কক্ষ ও লাঠিয়াল বাহিনীর জন্য পৃথক ঘর। 

সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পেতে কুঠিবাড়ীর চতুর্দিকে উচু প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। মিসেস মোরেলের দুই ছেলের মধ্যে রবার্ট মোরেল ছিল শান্ত প্রকৃতির। পক্ষান্তরে হেনরি মোরেল ছিল দুর্ধর্ষ ও বদমেজাজী। হেনরি তার ম্যানেজার হেলির সহযোগিতায় স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন চালাতে থাকে। এ সময় কৃষক নেতা জাহাঙ্গীরের ছেলে রহিমুল্লাহ ইংরেজি শেখার জন্য কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে তিনি পরিচিত হন মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্রের সঙ্গে। কিন্তু নিজের এলাকায় ইংরেজদের অত্যাচার ও নিপীড়নের কাহিনী জানার পর তিনি ইংরেজি শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বঙ্কিম চন্দ্রের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি দেশে ফিরে আসেন। গ্রামে  ফিরে এসে তার আট ভাই ও সঙ্গীদের নিয়ে এ এলাকায় ১৪০০ বিঘা জমি আবাদ করেন। এ খবর পেয়ে রবার্ট মোরেল তাকে ডেকে পাঠান। কিন্তু পেয়াদাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন রহিমুল্লাহ। এরপর আবারো মোরেল তার ব্যক্তিগত অনুচর পাঠান আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু রহিমুল্লাহ মোরেলের এলাকায় যেতে ঘৃণা প্রকাশ করেন। ফলে ‘বজরা’ বড় নৌকায় দুজনের সীমানার মধ্যবর্তী এলাকায় আলোচনায় বসেন। মোরেল ওই আলোচনায় রহিমুল্লাহ’র আবাদ করা ১৪শ’ বিঘা জমির খাজনা দেয়ার জন্য বলেন। কিন্তু খাজনা দিতে রাজি হননি রহিমুল্লাহ। পরে আবারো খাজনা দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে পেয়াদা পাঠান রবার্ট মোরেল। এই অনুরোধের বিপরীতে একটি কাঠের বাক্সে মহিলাদের ছেঁড়া জুতা পাঠিয়ে কর প্রদানের দাবি পুনরায় প্রত্যাখ্যান করেন। 

এভাবে কাজ হবে না ভেবে কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে রহিমুল্লাহর প্রতিবেশী ও সহযোগী গুনী মামুনকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন রবার্ট মোরেল। তাকে রহিমুল্লাহর এলাকার এক খন্ড জমি পত্তনি দেন রবার্ট মোরেল ও তার সহযোগী হেইলি। এ জমি দখলের নামে ১৮৬১ সালের ২১ নভেম্বর শেষ রাতে রামধন মালোর নেতৃত্বে হেনরি মোরেল ও হেইলি শতাধিক লাঠিয়াল নিয়ে রহিমুল্লাহর এলাকায় উপস্থিত হয়। রহিমুল্লাহও সঙ্গীদের নিয়ে লাঠিয়াল বাহিনীর ওপর বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রামধন মালোসহ ৭-৮ জন নিহত হলে লাঠিয়াল বাহিনীর অন্য সদস্যরা পালিয়ে যায়। হেনরি ও হেইলি ধরা পড়ে রহিমুল্লাহর হাতে। জীবনে এমন কাজ আর করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এটা যে কত বড় ভুল ছিল তা পরে প্রমাণিত হয়। এ ঘটনার পর বেইমান ও মিথ্যাবাদী হেনরি চারদিনের মধ্যেই শক্তিশালী অস্ত্রধারী বাহিনী সংগ্রহ করে ২৫ নভেম্বর রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে রহিমুল্লাহর বাড়িতে। ওই সময় বাড়িতে রহিমুল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ ছিল না। শত্রুর কথায় বিশ্বাস করে তেমন কোনো প্রতিরক্ষা ছাড়াই বাড়িতে অবস্থান করছিলেন রহিমুল্লাহ। সেদিন তার দুই স্ত্রী ও দুটি শিশু সন্তান ছাড়া বাড়িতে আর কেউ ছিল না। 
কিন্তু তারপরও তার দুই স্ত্রীর সহায়তায় সারারাত ধরে দুটি গাঁদা বন্দুকের সাহায্যে লড়াই চালাতে থাকেন সুসজ্জিত মোরেল বাহিনীর বিরুদ্ধে। বন্দুকের গোলা শেষ হয়ে গেলে স্ত্রীদ্বয়ের পায়ের খাড়ু, গলার হাঁসুলি এবং হাতের চুড়ি কেটে কেটে গোলার কাজ চালান। রাত শেষ হয়ে যাওয়ায় ইংরেজ বাহিনী রণে ভঙ্গ দিয়ে পূর্বদিকে চলে যেতে থাকে। বিপদমুক্ত মনে করে রহিমুল্লাহ বাড়ির বাইরে চলে আসেন। হঠাৎ উত্তর দিক থেকে গর্জে ওঠে বন্দুক। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এই অঞ্চলের স্বাধীনতার প্রথম শহীদ বীরযোদ্ধা রহিমুল্লাহ। বিশ্বাসঘাতক প্রতিবেশী ও ইংরেজদের কূটকৌশলের কাছে অবশেষে হার মানতে হয় মোরেলগঞ্জের প্রবাদ পুরুষ রহিমুল্লাহর। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে হেনরি ফিরে এসে গ্রামবাসীর ওপর শুরু করে অমানবিক নির্যাতন। রহিমুল্লাহর লাশ কচা নদীর মোহনায় ভস্মীভূত করা হয়। তার দুই স্ত্রী ও সন্তানদের বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা হয়। এক জেলের সহায়তায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় তার পরিবারের লোকজন। ওই খবর পেয়ে রহিমুল্লাহর সহপাঠী তৎকালীন এ এলাকার ম্যাজিস্ট্রেট সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র ছুটে আসেন বারইখালীতে। হেনরি, হেলি ও দুর্গাচরণ আত্মগোপন করে। আসামিদের অনেককে গ্রেফতার করে নিয়ে যান ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিম বাবু। তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। হেনরিকে গ্রেফতার করা হয় বোম্বে থেকে। দুর্গাচরণকে বৃন্দাবন থেকে। মামলা চলে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর। অজ্ঞাত কারণে ইংরেজদের কারও শাস্তি হয়নি। অন্য আসামিদের মধ্যে একজনের মৃত্যুদন্ড এবং ৩৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। বীর যোদ্ধা রহিমুল্লাহকে নিয়ে আজও মোরেলগঞ্জবাসী গর্বিত। অত্যাচারী মোরেলের নামানুসারে এই এলাকার নাম হয়েছে মোরেলগঞ্জ। অথচ ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়ে আত্মাহুতি দেয়া রহিমুল্লাহর নামানুসারে মোরেলগঞ্জের নাম পরিবর্তন করে রহিমগঞ্জ বা রহিমনগর করার জন্য মোরেলগঞ্জবাসীর প্রাণের দাবি আজও পূরণ হয়নি। পাশাপাশি সুন্দরবনকেন্দ্রিক সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থায় পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার  সুযোগ থাকলেও প্রত্ত্বতত্ত্ব বিভাগের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এমএইচএম

Link copied!