গোপনে ইরান থেকে জেট জ্বালানি কিনে বিপাকে মিয়ানমার

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মার্চ ৯, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
গোপনে ইরান থেকে জেট জ্বালানি কিনে বিপাকে মিয়ানমার

ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে গোপনে ইরান থেকে তিন দফায় জেট জ্বালানি আমদানি করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। বন্দরসংক্রান্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ডিসেম্বরের শুরু থেকে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মিয়ানমারের সামরিক সরকার এসব জ্বালানি আমদানি করে। জ্বালানি খাতের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, চলমান গৃহযুদ্ধে যে হারে জেট জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে, তাতে সামরিক বাহিনীর কাছে প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ দিনের মতো মজুত রয়েছে। তবে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন বিকল্প উৎস খুঁজতে হতে পারে জান্তাকে।

ওই সূত্র জানায়, তিনটি চালানই ইয়াঙ্গুনের কাছে থিলাওয়া বন্দরে অবস্থিত মিয়ান অয়েল টার্মিনালে পৌঁছায়। আগে ‘পুমা’ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি জেট জ্বালানি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বন্দর নথিতে দেখা গেছে, এমভি রিফ নামের একটি সরবরাহকারী জাহাজ জ্বালানির উৎস ইরাক বলে উল্লেখ করেছিল। তুলনামূলক ছোট এই জাহাজটি ইয়াঙ্গুন নদীর অগভীর পানিপথে চলাচলের উপযোগী এবং এতে প্রায় ১৮ হাজার ৩৭৬ টন জ্বালানি বহন করা সম্ভব, যা প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ব্যারেলের সমান।

স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সাবেক উপদেষ্টা ও অস্ট্রেলীয় অর্থনীতিবিদ শন টারনেল বলেন, ইরান থেকে মিয়ানমারে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি বাস্তব এবং তা সামরিক সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুরুতে তিনি এ বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন, তবে পরে নিশ্চিত হয়েছেন বলে জানান।

২০২১ সাল থেকে ইরান মিয়ানমারকে সামরিক ড্রোনও সরবরাহ করে আসছে। এছাড়া গত তিন বছরে দেশটিতে ইউরিয়াও পাঠিয়েছে, যা বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের হিসাবে, বছরে প্রায় ৪ লাখ থেকে ৬ লাখ টন ইউরিয়া সরবরাহ করা হয়েছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে ইরানের জেট জ্বালানি, ড্রোন ও ইউরিয়ার এই বাণিজ্য তেহরানের পূর্বঘোষিত নীতির সঙ্গে বড় ধরনের অমিল বলে বিশ্লেষকদের মত।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং ক্ষমতা দখল করার পর দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মিয়ানমারে উল্লেখযোগ্য পেট্রোকেমিক্যাল পরিশোধন সক্ষমতা নেই এবং দেশটি তাদের ডিজেল ও পেট্রলের প্রায় ৭০ শতাংশ সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশটিতে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার পরপরই মিয়ানমারে পেট্রলের দাম ৮০ কিয়াত (প্রায় ০.০৩৮ ডলার) বেড়ে যায় এবং তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শন টারনেল বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার দিক থেকে সামরিক সরকারের অবস্থা সব সময়ই চাপে থাকে। ইরানি জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হলে দামের যে বৃদ্ধি ঘটবে, তাতে জান্তার অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় মিয়ানমারের সামরিক সরকার ৭ মার্চ থেকে জ্বালানি রেশনিং ঘোষণা করেছে। এতে জোড় ও বিজোড় নম্বরপ্লেটের যানবাহনকে নির্দিষ্ট দিনে চলাচলের নিয়ম করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও জ্বালানি মজুত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মিয়ানমার সরকার সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে জ্বালানি মজুতের তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে ২০১৯ সালে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, সাধারণত পেট্রলের মজুত ৩৬ দিন, ডিজেলের ৩৫ দিন এবং জেট জ্বালানির মজুত প্রায় ১২০ দিনের সমান থাকে। শিল্প খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে পেট্রল ও ডিজেলের মজুত প্রায় ৩০ দিনে নেমে এসেছে।

দেশটির বড় শহরগুলোতে প্রায়ই পেট্রলপাম্পে জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। তবে সামরিক বাহিনী নিজেদের চাহিদা পূরণে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কম থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়লে তা নেপিদোর অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। পরিবহন, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দেন, ২০০৭ সালে জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহারের ফলে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, যা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে সংঘটিত ‘স্যাফরন বিপ্লব’-এর অন্যতম কারণ ছিল।

এদিকে থাইল্যান্ডের সঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তের পর মায়ে সাই, তাচিলেইক ও মায়ে সট–মিয়াওয়াদি সীমান্ত অঞ্চলে আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা দেখা গেছে। সূত্র: নিক্কেই এশিয়া।

এসএইচ 

Link copied!