যে কারণে ট্রাম্পের আক্রোশের শিকার হলেন মাদুরো!

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
যে কারণে ট্রাম্পের আক্রোশের শিকার হলেন মাদুরো!

ফাইল ছবি

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে তাঁদের নিউইয়র্কে নেওয়া হয়। বর্তমানে মাদুরোকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে।

এই ঘটনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে কী কারণ রয়েছে।

নিকোলাস মাদুরো রাজনীতিতে উঠে আসেন বামপন্থি নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে। এক সময়ের বাসচালক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা মাদুরো চাভেজের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৩ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন। তিনি ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা দলের শীর্ষ নেতা।

চাভেজ ও মাদুরোর প্রায় ২৬ বছরের শাসনামলে তাঁদের দল জাতীয় পরিষদ, বিচার বিভাগের বড় একটি অংশ এবং নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলেও বিরোধী পক্ষের দাবি ছিল ভিন্ন। তাদের সংগৃহীত ফলাফলে দেখা যায়, বিরোধী জোটের প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেস বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ থাকায় বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর পরিবর্তে প্রার্থী হন গনসালেস।

মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের সংগ্রামের জন্য গত অক্টোবরে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ভ্রমণনিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিনি ডিসেম্বরে গোপনে ওসলো পৌঁছে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে লাখো ভেনেজুয়েলান অভিবাসী প্রবেশের জন্য দায়ী করে আসছেন। ২০১৩ সাল থেকে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক দমন–পীড়নের কারণে আনুমানিক ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।

ট্রাম্পের অভিযোগ, মাদুরো কারাগার ও মানসিক আশ্রম খালি করে সেখানকার বন্দিদের জোর করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল ও কোকেনসহ মাদকের প্রবাহ ঠেকানোকে ট্রাম্প প্রশাসন বড় ইস্যু হিসেবে সামনে এনেছে। এ কারণে ভেনেজুয়েলার দুটি অপরাধী গোষ্ঠী ত্রেন দে আরাগুয়া এবং কার্টেল দে লোস সোলেসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, কার্টেল দে লোস সোলেসের নেতৃত্বে রয়েছেন মাদুরো নিজেই।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, কার্টেল দে লোস সোলেস কোনো সংগঠিত কাঠামো নয়; বরং কোকেন পাচারে জড়িত দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের বোঝাতে এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

মাদুরো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র মাদকবিরোধী যুদ্ধের অজুহাতে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এবং ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।

গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মাদুরো সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। প্রথমে মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে ঘোষিত পুরস্কার দ্বিগুণ করা হয়। পরে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক বহনের অভিযোগে একাধিক জাহাজে সামরিক অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে ৩০টির বেশি হামলা হয়েছে, যেখানে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ রয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মনে করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক এক প্রধান কৌঁসুলি বলেছেন, শান্তিকালে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে এ ধরনের পরিকল্পিত হামলা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের দাবি, এসব পদক্ষেপ সশস্ত্র সংঘাতের আইন মেনেই নেওয়া হয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে মাদক কার্টেল থেকে রক্ষা করা যায়।

অক্টোবরে ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলার ভেতরে গোপন অভিযান চালাতে সিআইএকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি যাদের নার্কো-সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে স্থলভাগে হামলার হুমকিও দেন।

মাদুরোকে আটক করার আগেও ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাদুরো বন্ধু নন এবং তাঁর সরে যাওয়া উচিত। এ অবস্থায় ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানিকে লক্ষ্য করে নৌ অবরোধসহ একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

এই পরিস্থিতিতে নিকোলাস মাদুরোর আটক শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং লাতিন আমেরিকা ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

এসএইচ 

Link copied!