বাজেট ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ: বিকেএমইএ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
বাজেট ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ: বিকেএমইএ

ফাইল ছবি

বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে শিল্প ও বিনিয়োগকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে সামগ্রিকভাবে সন্তোষজনক বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। তবে দেশের চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ ঋণসুদ এবং বাজেটের কিছু করনীতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগও তুলে ধরেছে সংগঠনটি।

শুক্রবার (১২ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এসব কথা বলেন। তিনি জানান, এবারের বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্পের দুটি প্রধান প্রত্যাশা ছিল করব্যবস্থার সংস্কার এবং চলমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমদানি সহজীকরণ করা। আশার কথা হলো, এ দুটি ক্ষেত্রেই সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সন্তোষজনক হয়েছে।

বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধা সম্প্রসারণ এবং মধ্যমেয়াদি নীতিকাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ শিল্প খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, মাউন্টিং স্ট্রাকচার ও সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর কর সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে।

মোহাম্মদ হাতেম জানান, দীর্ঘদিন ধরে শিল্পখাতের একটি বড় দাবি ছিল উৎসে কর্তিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়, বহন বা ফেরতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। বাজেটে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিষয়টি আরও স্পষ্ট ও সহজ করা প্রয়োজন। কারণ সময়মতো এআইটি সমন্বয় বা ফেরত না হলে উদ্যোক্তাদের কার্যকর মূলধন আটকে যায়, চরম তারল্য সংকট তৈরি হয় এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা অবান্তরভাবে বেড়ে যায়। তবে রপ্তানিমুখী নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবটিকে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিদ্যমান সুবিধা বহাল রাখা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করবে। এটি পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ধরনের সহায়তা করবে।

তবে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে ৫ শতাংশ কর আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির মতে, বর্তমানে দেশে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান এ পণ্য উৎপাদন করে, যার উৎপাদন ক্ষমতা মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা যেন পোশাক রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী সক্ষমতা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে বিষয়েও সরকারকে নজর দিতে হবে।

বাজেটে দেশের প্রধান সমস্যা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগের পথে তীব্র জ্বালানি সংকট এখনও অন্যতম বড় বাধা। সৌরবিদ্যুৎ আংশিক সমাধান দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

একই সঙ্গে উচ্চ ঋণসুদকেও শিল্প বিনিয়োগের আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প ব্যবসা পরিচালনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ঋণের ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ইদানীং উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আঞ্চলিক তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানান মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো শিল্পভূমি, মূলধন সহায়তা, শ্রমিক মজুরি সহায়তা এবং রপ্তানি প্রণোদনাসহ নানা আকর্ষণীয় সুবিধা দিচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে হবে।

অবশ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাজেটে কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে সংকটে থাকা ও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর জন্য ঘোষিত বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন।

সামগ্রিকভাবে বাজেটের নীতিগত দিককে ইতিবাচক উল্লেখ করে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য সম্পূর্ণ নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ও কার্যকর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সরকারের এসব উদ্যোগ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শিল্প পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এসএইচ 

Link copied!