বঙ্গভবন
তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর নয় মাস বাকি থাকতেই সরে গেলেন তিনি।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্রপতিই সেই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।
কারও দায়িত্ব শেষ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতায়, কারও বিদায় এসেছে সামরিক হস্তক্ষেপে, কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, আবার কেউ কেউ নিহত হয়েছেন সামরিক অভ্যুত্থানে।
সবশেষ মো. সাহাবুদ্দিনও রাষ্ট্রপতি পদে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই সরে গেলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। এক বছর পর ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও তিনি রাষ্ট্রপতি পদে রয়ে যান।
তার কাছেই শপথ নেন শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা।
আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা রাষ্ট্রপতি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বেশ কয়েকবারই তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। কিন্তু বিএনপি সেসময় রাষ্ট্রপতি পদে তার বহাল থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। দলটির নেতারা বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
এরইমধ্যে গত বছরের ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কারণে তিনি "অপমানিত" হয়েছেন এবং ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর পদত্যাগ করতে চান।
এরপর ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনিই তারেক রহমানসহ নতুন সরকারের সদস্যদের শপথ পড়ান। ওই সময়ও আলোচনা তৈরি হয়েছিল, বিএনপি সরকার তাকে রাখবে নাকি সরিয়ে দেবে।
তখন বিএনপির একাধিক নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদের এখনো অনেকটা সময় বাকি আছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি।
তবে পাঁচ মাস পরেই এখন আবার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। শেষপর্যন্ত ২৪শে জুলাই "গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার" কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন মো. সাহবুদ্দিন।
শেখ মুজিবুর রহমান: প্রথম রাষ্ট্রপতি থেকে আবার রাষ্ট্রপতি
শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে মুক্তিযুদ্ধের সময়, ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার নামে অভিহিত বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়েছিল।
যেহেতু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন, সেজন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে আসার পর শেখ মুজিবুর প্রধানমন্ত্রী হন এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে দুদিন পর ১২ই জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার। এর মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন।
শেখ মুজিবুর রহমানের যে পদক্ষেপ নিয়ে এখনো সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়, সেটি হচ্ছে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এই শাসন ব্যবস্থা বাকশাল নামে পরিচিত।
এই শাসন ব্যবস্থা শেখ মুজিবুর রহমান খুব বেশি দিন ধরে রাখতে পারেননি। বাকশাল প্রবর্তনের মাত্র সাত মাসের মাথায় সেনাবাহিনীর তৎকালীন কিছু কর্মকর্তা তাকে হত্যা করে।
শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ।
আবু সাঈদ চৌধুরী: স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডন থেকে ফিরে ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তখন শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে যান প্রধানমন্ত্রী।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময় নানা বিষয় নিয়ে আবু সাঈদ চৌধুরীর মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল এবং বিষয়গুলো তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে প্রকাশও করেছিলেন। মি. চৌধুরী মনে করতেন, তাকে অবহেলায় রাখা হয়েছে এবং তিনি দেশের কোনো কাজে লাগছেন না।
পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করেন ১৯৭৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর।
মুহম্মদুল্লাহ: দায়িত্বে এক বছর
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি করা হয় মুহম্মদুল্লাহকে। তিনি ছিলেন তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার।
১৯৭৪ সালের ২৭শে জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালে ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত এই পদে ছিলেন তিনি। তৎকালিন সরকার তাকে খুব একটা মূল্যায়ন করতো না বলে পত্রপত্রপত্রিকায় উঠে এসেছিল।
শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহর মেয়াদ শেষ হয়।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ: ৮১ দিনের রাষ্ট্রপতি
১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরে তাকে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের গঠিত বাকশালে খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য।
১৯৭৫ সালের তেসরা নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পর পাঁচই নভেম্বর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি।
তিনি রাষ্ট্রপতি হলেও তখন রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল কার্যত তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ছিলেন 'ক্ষমতাহীন' রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দিয়ে সারা দেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন।
এ বিষয়টিকে অনেকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেন। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং বেসামরিক রাষ্ট্রপতি কীভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হতে পারেন সেটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল।
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগের পর অবসর জীবনে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম একটি বই লিখেছেন 'অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ'। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যান। মূলত, তাৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান চাননি যে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম আর রাষ্ট্রপতি থাকুক।
১৯৭৭ সালের ২১ শে এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। যদিও মি. সায়েম-এর পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল তার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের বিষয়টি।
জিয়াউর রহমান: হত্যাকাণ্ডের শিকার রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তালিকায় জিয়াউর রহমানের দায়িত্বকালও দু'টি পর্বে দেখানো হয়েছে। ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম সরিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
এরপর তিনি ১৯৭৮ সালের ১২ই জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে ওই বছর নির্বাচনে জয়ী হয়ে ওই দিন-ই তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন করে শপথ নেন।
তার আগে ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জিয়াউর রহমান উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন।
ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। তবে এ নির্বাচন নিয়েও বেশ বিতর্ক ছিল।
জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধানের পদ না ছেড়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি গঠন করেন।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে।
১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে সার্কিট হাউসে একদল সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে।
আবদুস সাত্তার: সামরিক অভ্যুত্থানে অপসারিত
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় বিচারপতি আবদুস সাত্তার ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি। কিন্তু জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ৩০শে মে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন।
দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে ১৫ই নভেম্বর দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। যদিও সে নির্বাচন নিয়ে বেশ বিতর্ক ছিল।
কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার চার মাসের কিছু বেশি সময় পর, ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নির্বাচিত বেসামরিক রাষ্ট্রপতি, যাকে সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়।
আহসান উদ্দীন: সামরিক শাসনের ছায়ায় রাষ্ট্রপতি
১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। এর তিনদিন পর তিনি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসান।
কিন্তু বিচারপতি চৌধুরীর কোনো প্রকার কর্তৃত্ব ছিল না, কারণ ঘোষিত সামরিক আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা ছিল যে সিএমএলএ'র উপদেশ বা অনুমোদন ব্যতীত রাষ্ট্রপতি কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ বা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন না।
আহসান উদ্দিন চৌধুরী ২০ মাসের মতো রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন। এক পর্যায়ে জেনারেল এরশাদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতি হন।
এইচ এম এরশাদ: গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকাল রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তালিকায় দুই ভাগে দেখানো হয়েছে। প্রথম পর্বে তিনি সামরিক শাসক হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে নতুন করে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মূলত, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিভিন্ন সংবাদপত্রে রাজনীতিতে তার আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকেন।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এরপর ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন। তিনি দেশের সংবিধানকে রহিত করেন, জাতীয় সংসদ বাতিল করেন এবং সাত্তারের মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করেন।
সেইসাথে, তিনি নিজেকে দেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন, যে সাংবিধানিক পদটি একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের প্রাপ্য ছিল।
তিনি ঘোষণা করেন যে ভবিষ্যতে সামরিক আইনের অধীনে জারিকৃত বিধিবিধান ও আদেশই হবে দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং এর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সকল আইন অকার্যকর হবে।
এরপর এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৭শে মার্চ বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। কারণ সামরিক আইন (মার্শাল ল) অনুযায়ী, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বা সিএমএলএ -এর পরামর্শ বা অনুমোদন ছাড়া রাষ্ট্রপতি কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন না।
১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এরশাদ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে দেশ শাসন করেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রপতি আহসান উদ্দীন চৌধুরীকে অপসারণ করে ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, প্রায় দুই বছর ১০ মাস এভাবেই চলে।
এরপর ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সে বছরের ২৩শে অক্টোবর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন করে শপথ নেন তিনি। এরপর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়।
এরশাদ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন এবং নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন করে শপথ নেন। এরপর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়।
কিন্তু নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রায় চার বছর এক মাস দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯০ সালের ছয়ই ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তিনি ক্ষমতায় থাকার সময় দু'টো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়- একটি ১৯৮৬ সালে এবং আরেকটি ১৯৮৮ সালে। এ দু'টি নির্বাচন নিয়েই বিতর্ক ছিল।
সবমিলিয়ে, তখন সবগুলো বড় রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে এবং তিনি তখন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ: দুই মেয়াদের রাষ্ট্রপতি
অধ্যাপকএ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর আগের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বাংলাপিডিয়া বলছে, তিনি আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৯৬ সালের ২৩শে জুলাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং নয়ই অক্টোবর শপথ গ্রহণ করেন।
তিনি পাঁচ বছরের সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ করার পর আরও প্রায় এক মাস পদে বহাল ছিলেন এবং ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তবে ১৬তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারী তিন জোটের অনুরোধে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি।
নব্বইয়ের ছয়ই ডিসেম্বর থেকে পরের বছরের নয়ই অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। তার প্রধান দায়িত্ব ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা। তিনি একই সঙ্গে প্রধান নির্বাহী ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
১৯৯১ সালের সে নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি।
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরল সমঝোতায় দ্বাদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর উত্তরসূরি নির্বাচন করেই তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে সুপ্রিম কোর্টে ফিরে গিয়েছিলেন।
নতুন রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের পর সাহাবুদ্দীন আহমদ ১৯৯১ সালের ১০ই অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে ফিরে যান।
সাহাবুদ্দীন আহম দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার দিন, ১৯৯১ সালের নয়ই অক্টোবর, থেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং তিনি তার মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন। ১৯৯৬ সালের নয়ই অক্টোবর ঠিক পাঁচ বছর পরেই তার মেয়াদ শেষ হয়।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ: একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা
জিল্লুর রহমানের আগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ। অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির তরফ থেকে নির্বাচিত করা হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্যকে।
২০০২ সালের ছয়ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। তার স্বাভাবিক পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে।
কিন্তু বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর পর ২০০৬ সালে বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের সঙ্গেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও নেন।
রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়াটা তখন তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয় এবং এই ঘটনা সে সময় দেশের রাজনীতিতে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল বলে মনে করা হয়।
এরপর সংসদ নির্বাচন নিয়ে অব্যাহত রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়েন এবং দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। তবে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েননি।
ইয়াজউদ্দিন আহমদ প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়ার পরদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হওয়া পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন এবং ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি ইয়াজউদ্দিন আহমদও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন।
অর্থাৎ, ইয়াজউদ্দিন আহমদের পাঁচ বছরের সাংবিধানিক মেয়াদ ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হলেও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
সেক্ষেত্রে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টি তার দ্বিতীয় মেয়াদ ছিল না, এটি ছিল উত্তরসূরি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত পদে বহাল থাকা। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তথ্যেও তার দায়িত্বকাল একটানা একটি মেয়াদ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য, ইয়াজউদ্দিন আহমদ বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি হলেও তাকে নিয়ে এক পর্যায়ে বিএনপি নেতারাও সমালোচনা করেছিলেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, ২০০৭ সালে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ থামাতে তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী: কয়েক মাসেই পদত্যাগ
২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর বাংলাদেশের ১৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। কিন্তু সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১শে জুন পদত্যাগ করেন মি. চৌধুরী। সেসময় বিএনপি সংসদে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেছিল।
বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এমন নাটকীয় পদত্যাগের ঘটনা আর ঘটতে দেখা যায়নি। তার আগে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে অনেক সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের দাবি তুলেছিলেন এবং তাকে ইমপিচ করার হুমকিও দিয়েছিলেন।
ইমপিচ অর্থ হলো অভিশংসন, যার মানে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ এনে অপসারণের প্রক্রিয়া।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাত মাসের মাথায় তাকে কেন বিদায় নিতে হয়েছিল, তার নানাবিধ কারণ উল্লেখ করে তখনকার সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল।
যেসব কারণের কথা ওইসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, তার মধ্যে রয়েছে:
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার সমাধিতে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদন না করা। রাষ্ট্রপতির বাণীতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করা।
বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনাকে মুন্সিগঞ্জে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতির ছেলে এবং সংসদ সদস্য মাহী বি. চৌধুরীর তোরণ নির্মাণ।
রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন বক্তব্যে 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' ব্যবহার না করা। কারণ 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' বিষয়টি বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ধারণ করে।
তার পদত্যাগের পর সেই সময়ের স্পিকার ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার প্রায় আড়াই মাস ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
পরে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তার দায়িত্ব শেষ হয়।
জিল্লুর রহমান: দায়িত্বে থাকতেই মৃত্যু
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে জিল্লুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ, দল গঠন ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বাংলাদেশে জরুরি আইন জারির পর ১৬ই জুলাই রাতে শেখ হাসিনা গ্রেফতার হলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে তিনি দল পরিচালনার দায়িত্ব নেন।
এরপর ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-ই জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। নবম জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার জিল্লুর রহমানকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেয়। ২০০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
কিন্তু ২০১৩ সালের ২০শে মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। ফলে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।
তার মৃত্যুর পর তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন; তিনি হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি পরপর দুই মেয়াদে দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
আবদুল হামিদ তার প্রথম মেয়াদে ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৮ সালের সাতই ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন তিনি। সূত্র: বিবিসি বাংলা
এম