পাম্পে হাহাকার, সিএনজি চালকদের পথেই কাটছে দিনের অর্ধেক

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: আগস্ট ১৯, ২০২৬, ১১:৪০ এএম
পাম্পে হাহাকার, সিএনজি চালকদের পথেই কাটছে দিনের অর্ধেক

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখন কেবলই দীর্ঘ প্রতীক্ষার ছবি। গাড়ি আছে, চালক প্রস্তুত, এমনকি রাস্তার মোড়ে মোড়ে যাত্রীরও অভাব নেই; তবে গাড়ি চালানোর প্রধান অনুসঙ্গ সিএনজির দেখা মিলছে না। গ্যাস নিতে আসা যানবাহনের সারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা থমকে থাকছে পাম্পের মুখে।

কোথাও সংযোগ লাইনে গ্যাসের তীব্র সংকট, আবার কোথাও চাপ এতই কম যে প্রয়োজনীয় গ্যাস মিলছে না। দিনের সিংহভাগ সময় লাইনে বসেই পার হয়ে যাওয়ায় চালকদের আয় নেমে এসেছে তলানিতে, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে নগরের পরিবহন ব্যবস্থা।

গত ৯ আগস্ট থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর তেজগাঁও, উত্তরা, কুড়িল, রামপুরা, মগবাজার, মিরপুর ও বাড্ডা এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘুরলে এই একই করুণ চিত্র চোখে পড়ে। অনেক স্টেশনে সকাল থেকেই অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। আবার পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বেশ কয়েকটি পাম্পে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘গ্যাস নেই’ লেখা নোটিশ। যেগুলো খোলা রয়েছে, সেগুলোতে চাপ কম থাকায় সামান্য গ্যাস নিতেই চলে যাচ্ছে দীর্ঘ সময়।

বাড্ডার একটি স্টেশনে গ্যাসের চাপ ১২০ বারে নেমে আসায় গাড়িগুলোতে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। রামপুরা ও প্রগতি সরণির ফিলিং স্টেশনগুলোর লাইনের শেষ ভাগ গিয়ে ঠেকেছে অনেক দূরের মোড়গুলোতে।

গ্যাসের এমন চরম সংকটে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সিএনজি চালকরা। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় চালকদের দিনে একাধিকবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, এতে কেবল গ্যাস সংগ্রহ করতেই পার হয়ে যাচ্ছে দৈনিক ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। এতে তাদের কাজের সময় কমে গিয়ে রোজগার অর্ধেকে নেমে এসেছে। কিন্তু আয়ের অঙ্ক কমলেও সিএনজি অটোরিকশার মালিকদের নির্ধারিত দৈনিক জমা বা ভাড়ার ক্ষেত্রে মিলছে না কোনো ছাড়।

ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ অপেক্ষায় কাজের সময় নষ্ট হলেও অনেক মালিকই প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত জমা আদায় করছেন, যা চালকদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই অচলাবস্থার মূলে রয়েছে দেশের জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের গ্যাস ঘাটতি। গত ২১ জুলাই মহেশখালী উপকূলে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ একযোগে কমে যায়। বাসাবাড়ি, শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি যার সরাসরি প্রভাব এসে পড়ে শহরের সিএনজি স্টেশনগুলোর ওপর। সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও পেট্রোবাংলার হিসাব বলছে, চাহিদার তুলনায় মোট সরবরাহ এখনও প্রায় অর্ধেক।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বছরের পর বছর ধরে বিদেশি জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ফল। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও সৌরশক্তির মতো বিকল্প উৎসে নজর না দেওয়ায় আজ পুরো খাতকে এমন সংকটে পড়তে হয়েছে।

অন্যদিকে দায়িত্বশীলদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অব্যবস্থাপনা, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামের কারণে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই সংকট রাতারাতি মিটিয়ে ফেলা সম্ভব নয়।

মহেশখালীর টার্মিনাল পুরোপুরি মেরামত ও সচল হওয়ার আগ পর্যন্ত শিল্প ও পরিবহন খাতে স্বস্তি ফেরাতে সরকারের হাতে এই মুহূর্তে অলৌকিক কোনো সমাধান নেই। ফলে গ্যাসের জন্য এই দীর্ঘ ও ভোগান্তিময় অপেক্ষা আপাতত নগরীর চালকদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ হয়ে রইল।

এসএইচ 

Link copied!