ফাইল ছবি
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে স্কেল বা মহার্ঘ ভাতা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই চলছে নানা গুঞ্জন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে চটকদার ও নজরকাড়া খবর। তবে এসব খবরকে ছাপিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল এখনো একপ্রকার নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে-আসলে পে স্কেল নিয়ে সরকারের ভাবনা কী? আসন্ন বাজেটে কি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন কোনো সুখবর থাকছে, নাকি অপেক্ষার প্রহর আরও দীর্ঘ হচ্ছে?
অর্থ মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নতুন কোনো পে স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণার বিষয়ে সরকার এই মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করতে চাচ্ছে না। এর পেছনে প্রধান কারণ বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকেই এখন সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন পে স্কেল বা বড় অঙ্কের মহার্ঘ ভাতা একবারে ঘোষণা করা হলে বাজারে এর একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে। ফলে বেতন বাড়ার আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরেক দফা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি স্বয়ং সরকারি চাকরিজীবীদেরও ভোগান্তিতে ফেলতে পারে। এই বাস্তবতার কারণেই সরকার বিষয়টিতে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সতর্কতা অবলম্বন করছে।
এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের মনে বড় একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো এলে তাদের মূল বেতন কীভাবে সমন্বয় বা ফিক্সেশন করা হবে? প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র বলছে, সাবেক সচিব জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন পে-কমিশনের সুপারিশ বড় কোনো কাটছাঁট ছাড়াই সচিব কমিটি চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের মূল বেতন একটি গাণিতিক সমতা বজায় রাখা হবে।
যদি খসড়া সুপারিশ অনুযায়ী মূল বেতন গড়ে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়, তবে সমন্বয় পদ্ধতিটি কেমন হতে পারে তা নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। উদাহরণস্বরূপ, ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন বর্তমানে ২২ হাজার টাকা। যদি প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতে এই গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৪৫ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, তবে যিনি আজ নতুন যোগদান করেছেন তার মূল বেতন সরাসরি ৪৫ হাজার ১০০ টাকায় উন্নীত হবে।
অন্য দিকে, যিনি ৯ম গ্রেডে দীর্ঘদিন চাকরি করে নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট পেয়ে বর্তমানে ৩৬ হাজার টাকা মূল বেতন পাচ্ছেন, তার ক্ষেত্রে নতুন স্কেলের সমপরিমাণ বা পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে। নতুন স্কেলের শুরুর ধাপ ৪৫ হাজার ১০০ টাকা হওয়ায়, ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বেতন তার বর্তমান স্কেলের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধিতে প্রাপ্ত সম্ভাব্য ৫৪ হাজার টাকার কাছাকাছি কোনো ধাপে গিয়ে ঠেকবে। অর্থাৎ, নতুন স্কেল চালুর ফলে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ইনক্রিমেন্টের সুবিধা বাতিল হবে না, বরং তাদের বর্তমান মূল বেতনের সাথে আনুপাতিক হার বজায় রেখেই নতুন স্কেলের উচ্চতর ধাপে তা ফিক্সেশন বা সমন্বয় করা হবে।
তাহলে আসন্ন বাজেটে পে স্কেল নিয়ে কোনো বরাদ্দ থাকছে কি না-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, প্রথাগতভাবে বাজেটে সরাসরি 'নতুন পে স্কেল' নামে বড় কোনো থোক বরাদ্দ রাখার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়মিত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিশেষ ভাতার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ বরাবরের মতোই রাখা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র আভাস দিয়েছে, ঢালাওভাবে নতুন স্কেল না দিয়ে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের স্বস্তি দিতে বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই কিছু ভাতা বা বিশেষ প্রণোদনার রূপরেখা নিয়ে ভেতরে-ভেতরে কাজ চলছে। তবে সেটি চূড়ান্ত বাজেট প্রস্তাবনার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার এখন অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে পা ফেলছে। ঢালাও কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নে বাজেট ঘাটতি বাড়াতে চায় না অর্থ বিভাগ।
সরকারি মহল থেকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত চটকদার কোনো খবরে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রেরণের অপেক্ষায় রয়েছে। চূড়ান্ত উত্তর মিলবে আগামী জুনে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের দিন। তত দিন পর্যন্ত পে স্কেল নিয়ে সরকারের এই 'কৌশলগত নীরবতা' বজায় থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসএইচ
আপনার মতামত লিখুন :