জাতিসংঘের অধিবেশনে যেসব বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম
জাতিসংঘের অধিবেশনে যেসব বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যু তুলে ধরে ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

নিউইয়র্ক সময় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৫টা এবং বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ভাষণে তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনীতি, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটি তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ। প্রায় পুরো বক্তব্যজুড়েই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

শহীদদের স্মরণ

ভাষণের শুরুতেই বাংলাদেশের সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদানকে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করেন তিনি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদ ও আহতদের প্রতিও অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানান।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ।

নির্বাচন ও গণতন্ত্র

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’

জিয়া ও খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ

জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে তিনি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই তাঁর পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।’

সংঘাতের সমাধান আলোচনায়

বিশ্বের চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্লোবালাইজেশনের এই সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তে যা কিছুই ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানবসৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে এবং তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট।

তিনি বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।’

ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন

স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে।

এর ফলে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।’

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ COP-31 এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করে।’

বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। দেশকে বন্যা-খরার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচিও শুরু হয়েছে।

অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান

বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তাঁর উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়।’

তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

নারীর ক্ষমতায়ন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন।

নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে।

এ লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।

প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলেও জানান তিনি।

শিক্ষায় গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপি বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ ও পোশাক অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সতর্কতা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ গড়বে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়ো-টেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

জাতিসংঘের প্রতি বাংলাদেশের প্রত্যাশা

চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All’—অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।

‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’

ভাষণের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সকল নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনরায় ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।

Link copied!