ফাইল ছবি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃস্থাপনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হলেও নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন এবং জটিল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে মতপার্থক্য কাটেনি।
জুলাই জাতীয় সনদে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি থেকে শুরু করে ৫ যোগ ৫ যোগ ২ পদ্ধতি, বিচার বিভাগের প্রতিনিধিত্ব এবং র্যাংকড চয়েস ভোটের মতো জটিল কাঠামো নিয়ে একাধিক দলের নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে। ফলে এই ব্যবস্থাকে একটি কার্যকর সাংবিধানিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া বর্তমান সংসদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি এ বিষয়ে ধারাবাহিক বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব নেওয়া হচ্ছে।
কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এমনভাবে সংবিধানে প্রতিস্থাপন করা হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার চাইলেই এটি সহজে বাতিল করতে না পারে এবং এর জন্য গণভোটের প্রয়োজন হয়। এছাড়া রাষ্ট্রপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারবেন না বলেও কমিটির প্রাথমিক মতামত রয়েছে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার বড় একটি রাজনৈতিক সংকট হলো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশের অনুপস্থিতি। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের সমমনা দলগুলোর বর্জনের মুখে বিরোধী দলহীনভাবেই এগিয়ে চলেছে সংবিধান সংশোধনের এই উদ্যোগ।
এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বর্তমান কমিটিকে 'আমরা-মামুরা সংশোধন কমিটি' হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেছেন এবং ২০০৬ সালের মতো একদলীয় নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকেও নোট অব ডিসেন্টসহ পুরো জুলাই সনদ সংসদে তোলার দাবি জানানো হয়েছে।
জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ শেষের ৩০ দিনের মধ্যে স্পিকারের তত্ত্বাবধানে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠিত হবে। এই কমিটি ১২০ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করবে। এই ধাপে ব্যর্থ হলে সরকারি দল, প্রধান বিরোধী দল এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলগুলোর প্রস্তাবিত ১২ জনের তালিকা থেকে ৫ যোগ ৫ যোগ ২ পদ্ধতিতে নাম চূড়ান্ত করার বিধান রয়েছে। এতেও সুরাহা না হলে বাছাই কমিটিতে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতি যুক্ত করে সাত সদস্যের কমিটিতে গোপন ব্যালটে র্যাংকড চয়েস বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বিচার বিভাগের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি এবং র্যাংকড চয়েস পদ্ধতির মতো জটিল ধাপগুলোতে বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তাদের দাবি, এ ধরনের সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার পদ শূন্য হলে উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে ভিন্নমত।
আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিশেষ কমিটির। বিরোধী দলগুলোর বয়কট এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টের মতো বড় রাজনৈতিক জটিলতা এড়িয়ে জুলাই সনদের এই রূপরেখা শেষ পর্যন্ত কীভাবে সংসদীয় ও সাংবিধানিক রূপ নেয়, এখন সেটির দিকেই তাকিয়ে আছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন।
এসএইচ