একজন লতিফুর রহমান

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ৬, ২০১৭, ০২:০৮ পিএম
একজন লতিফুর রহমান

ঢাকা: বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও রাজনীতিতে লতিফুর রহমান এখন ইতিহাস। রাজনৈতিক এক সংকটকালে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশের হাল ধরে ছিলেন তিনি। তার ওপর ভরসা করতে পেরেছিল সকল রাজনৈতিক দল ও মহল। ৯৬ এর রাজনৈতিক অস্থিরতার পুনরাবৃত্তি হয়নি ২০০১ সালে।

২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকালে বিনা প্রশ্নেই তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে গ্রহণ করে বিরোধী দলে থাকা বিএনপি, সদ্য ক্ষমতা ছাড়া দল আওয়ামী লীগ। মেনে নেয় জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বামপন্থী দলগুলো। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। মঙ্গলবার (৬ জুন) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় বলে হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম তুহিন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছে ৮১ বছর।

যে কারণে তিনি স্মরণীয়
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে সরকার পরিচালনা করে আওয়ামী লীগ। নিয়ম অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন লতিফুর রহমান।

বিচারপতি লতিফুর রহমান ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই মাস বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তার নেতৃত্ত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই ২০০০ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি- জামায়তের নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার গঠন করে। ওই বছর ১০ অক্টোবর নতুন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। 

২০০১ সালে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় জিমি কার্টারের সম্মানে লতিফুর রহমানের দেওয়া মধ্যাহ্ন ভোজে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াও যোগ দেন। তিনিই দুই প্রধান দলের প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে এক টেবিলে নিয়ে এসেছিলেন আলোচনার জন্য। 

৯৬ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতা না ছেড়েই মেয়াদ শেষে সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও বামদলগুলো এই নির্বাচনের বিরোধিতা করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন করার জন্য আন্দোলন করে সকল দল। দাবির মুখে বিএনপি তত্বাবধায়ক সরকার দাবি মেনে নেয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ফের সরকার গঠন করে বিএনপি। সংবিধানে তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংযোজন করে ক্ষমতা ছাড়ে। সেই নির্বাচন ছিল সমঝোতার নির্বাচন।

এ দাবি আদায়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক টানা এক মাসেরও বেশি হারতাল-অবরোধ করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে যা অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। সেই উত্তাল দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী একমঞ্চে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করেছে। পুরো দেশ অচল হয়ে পড়েছিল। জনরোষ থেকে বাচতে বিএনপিও অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আসে।

ঢাকায় ২০০১ সালে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় জিমি কার্টারের সম্মানে লতিফুর রহমানের দেওয়া মধ্যাহ্ন ভোজে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াও যোগ দেন।

কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতার পালাবদলকালে ৯৬ এর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। দুই দলই তাকে গ্রহণ করেছিল। শান্তিপূর্ণভাবে সকল দলের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনে আনতে পেরেছিলেন। দায়িত্ব নিয়েই অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে সারাদেশে অভিযান চালিয়েছেন। সরকারি জমি থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিলেন। প্রশাসনকে চালিয়েছিলেন নিজস্ব গতিতে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আয়োজন করেছিলেন ভোটারদের অংশগ্রহণমূলক ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।

তার মতো গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির সংকটে পড়ে বাংলাদেশ ২০০৬ সালে। বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়লেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে যেতে পারেনি। নিয়মের ধারাবাহিকতা রক্ষায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। নিয়ম অনুযায়ী তৎকালীন সময়ে সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতির প্রতি অনাস্থা জানায় আওয়ামী লীগ। এর আগের প্রধান বিচারপতি রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিজেকে জড়াতে চাননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে প্রধান উপদেষ্টা পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠে। 

দেশে তৈরি হয় রাজনৈতিক সংকট। সেই সংকট সমাধানে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ে সেনাবাহিনী। ক্ষমতার নেপথ্যে থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিচালনা করে। দুই বার পুনর্বিন্যাস করা হয় উপদেষ্টা পরিষদ। তিন মাসের পরিবর্তে একটানা দুই বছর দেশ চালায় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।

২০১৪ সালে সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে উচ্চ আদালতের রায়ে তা আর হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থেকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। বিএনপি ও জামায়াতসহ অধিকাংশ দল সেই নির্বাচন বর্জন করে। প্রশ্নবিদ্ধ সেই নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পায়। তখন থেকে এক রাজনৈতিক সংকট চলছে দেশে, যা এখনো সমাধান হয়নি।

যশোর বারের আইনজীবী খান বাহাদুর লুৎফর রহমানের তৃতীয় সন্তান লতিফুর রহমানের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১ মার্চ, যশোরে। তার মামা বিচারপতি নুরুল হুদাও এক সময় হাই কোর্টের বিচারক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার পর সেখানেই এল এল বি করেন লতিফুর রহমান।

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে শিক্ষকতার মধ্যে দিয়ে চাকরি জীবন শুরু করলেও পরে ১৯৬০ সালে তিনি আইন পেশায় যোগ দেন। বাংলাদেশের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল এম এইচ খন্দকারের শিক্ষানবিশ ছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হন লতিফুর রহমান। ১৯৮১ সালে হন স্থায়ী বিচারপতি। ১৯৯০ সালে আপিল বিভাগের বিচারপতি হন তিনি। ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। ২০০১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসর গ্রহণ করেন। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন লতিফুর রহমান।

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি অবসরে যান। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দিনগুলি ও আমার কথা’ নামে একটি বইয়ে লতিফুর রহমান তার ৮৭ দিন সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন। এছাড়া বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে লিখেছেন ‘কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ’

লতিফুর রহমানের স্ত্রীর নাম আয়েশা বেগম। শম্পা, রুম্পা ও নিপা নামে তাদের তিন মেয়ে রয়েছেন। বিচারপতি লতিফুর রহমানের মৃত্যুতে আলাদা বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও  মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তারা তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মঙ্গলবার (৬ জুন) বেলা ১১টার পর থেকে সুপ্রিম কোর্ট বিরতির পরে বসেননি। 

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আতা

Link copied!