আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতির ভিত্তি হবে ঐক্য ও পারস্পরিক আস্থা—বিভাজন, বিদ্বেষ বা প্রতিহিংসা নয়।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সামিট–২০২৬ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল ৯টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সম্মেলনে দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, নীতিনির্ধারক, কূটনৈতিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যক্তিরা অংশ নেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাস করে যেখানে আধুনিক বাজার অর্থনীতি কার্যকর থাকবে, প্রশাসন হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক এবং ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে। তার মতে, ন্যায়, নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তি ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
নারীর ক্ষমতায়ন ও সমান অধিকার
নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী অগ্রগামী অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে দলের মোট সদস্যের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী—যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
তিনি জানান, নতুন বাংলাদেশে নারীদের জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে তাদের অংশগ্রহণে কোনো বৈষম্য রাখা হবে না।
তরুণদের ঘিরে রাষ্ট্র সংস্কারের পরিকল্পনা
তরুণ সমাজকে দেশের অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যুব কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তার ভাষায়, কর্মসংস্থানহীন তরুণ সমাজ রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি, আর কর্মক্ষম তরুণরাই পারে দেশকে এগিয়ে নিতে।
তিনি একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন, যেখানে মুক্ত ও স্বচ্ছ বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
একই সঙ্গে দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেন কখনোই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়—এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী আপসহীন থাকবে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে জামায়াত আমির বলেন, কৃষিকে অবহেলা করে কোনো দেশ টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না।
সংখ্যালঘু অধিকার ‘ধর্মীয় দায়িত্ব’
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষাকে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানান, জামায়াতে ইসলামীর দলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রায় পাঁচ লাখ সদস্য সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।
তিনি বলেন, ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় তার দল কোনো আপস করবে না।
ঐক্যের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ
বক্তব্যের শেষাংশে জামায়াত আমির বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সময় বিভাজনের নয়—বরং একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
এম
আপনার মতামত লিখুন :