ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনে ভোটারদের মধ্যে এখনো সিদ্ধান্তহীনতা বিরাজ করছে। বাসাবো এলাকার আসবাবপত্রের কারিগর মো. বাদল এখনো ঠিক করতে পারেননি কাকে ভোট দেবেন।
সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ও রাতে বাসাবো ও মান্ডা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে প্রচারের উত্তাপ। প্রার্থীরা দলবেঁধে প্রচারণা চালাচ্ছেন, ভ্যানে নির্বাচনি গান বাজছে, চলছে উঠান বৈঠক ও জনসংযোগ। রাস্তায় বিজিবি ও পুলিশের উপস্থিতিও লক্ষণীয়।
সবুজবাগ, মতিঝিল, ডেমরা ও মান্ডা থানা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট এক ডজন প্রার্থী থাকলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনজন—সবাই ভোটের মাঠে নতুন মুখ। বাদলের ভাষায়, “তিনজনই প্রথমবারের মতো নির্বাচনে নেমেছেন, তিনজনেরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুবই কঠিন। এতটাই কাছাকাছি যে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না কোন দিকে মোড় নেবে ভোট।”
তিনি উল্লেখ করেন বিএনপি মনোনীত হাবিবুর রশিদ হাবিব, স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া রাসিনের কথা। বয়সে হাবিব ৫৩ বছর হলেও ভোটের অভিজ্ঞতায় তিনজনই নবীন। অন্যদিকে রাসিন ৩৬ ও জারা ৩২ বছর বয়সী। বাদলের মতে, “এবারের নির্বাচনে তিনজনের মধ্যে কঠিন লড়াই হবে।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৭, ৭১ থেকে ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন। এর মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন ৫ হাজার ৯৫৪ জন।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা হলেন—বিএনপির হাবিবুর রশিদ হাবিব (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র তাসনিম জারা (ফুটবল) এবং এনসিপির মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া রাসিন (শাপলা কলি)।এছাড়া লড়াইয়ে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের শাহ ইফতেখার তারিক (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির কাজী আবুল খায়ের (লাঙ্গল), সিপিবির মো. মনিরুজ্জামান (কাস্তে), বিএনএফের মোহাম্মদ শফি উল্লাহ চৌধুরী (টেলিভিশন), এনপিপির শাহীন খান (আম), বাসদ (মার্কসবাদী)-এর খন্দকার মিজানুর রহমান (কাঁচি), গণফোরামের নাজমা আক্তার (উদীয়মান সূর্য), ইনসানিয়াত বিপ্লবের নাহিদ হাসান চৌধুরী জুনায়েদ (আপেল) এবং মুসলিম লীগের মাসুদ হোসেন (হারিকেন)।
ভোটারদের দাবি ও প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি
বাসাবো ছায়াবীথির গৃহিণী মাহমুদা আক্তার বলেন, “এলাকার প্রধান সমস্যা গ্যাস সংকট, রাস্তা অর্ধেক করে ফেলে রাখা ও ব্যাটারি রিকশার উৎপাত। যিনি এগুলো সমাধান করতে পারবেন, তাকেই ভোট দেব। তবে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।”
বাসাবো মাঠ সংলগ্ন হোটেল মালিক মো. শাহজাহানের দাবি, “রাস্তাঘাট ঠিক করা ও মুগদা হাসপাতাল সম্প্রসারণ দরকার।” তিনি মনে করেন বিএনপির হাবিব এগিয়ে রয়েছেন।
দক্ষিণ বনশ্রীর মাহবুবুল হক শিশির বলেন, “কোরবানির হাটের কারণে মেরাদিয়া এলাকায় যাতায়াতে সমস্যা হয়। যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি যেন এটা সমাধান করেন।”
হাবিবুর রশিদ হাবিব মুগদা হাসপাতাল আধুনিকীকরণ, শিক্ষা-যুব উন্নয়ন, নারী-শিশু নিরাপত্তা, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
তাসনিম জারা গ্যাস সংকট নিরসনে ‘সেবা নেই, বিল নেই’ নীতি, মাদক-সন্ত্রাসমুক্ত এলাকা, মুগদা হাসপাতালকে আদর্শ সেবা কেন্দ্রে পরিণত করা, শিক্ষা মানোন্নয়নের ঘোষণা দিয়েছেন।
জাবেদ মিয়া রাসিন মানসম্মত শিক্ষা, ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা, রাস্তা-ড্রেনেজ স্থায়ী সংস্কার, কিশোর গ্যাং ও মাদক প্রতিরোধের অঙ্গীকার করছেন।
বিএনপির পুরোনো ঘাঁটি, তরুণদের সম্ভাব্য চমক
মান্ডা ঝিলপাড়ের দোকানি মোকারম আলী বলেন, “মুগদা, মান্ডা, বাসাবো বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। তারা পুরোদমে প্রচার চালাচ্ছে। হাবিব সাহেব এগিয়ে।”
তবে তরুণ ভোটার তাহমিদের মতে, “৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণরা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝেছে। পুরোনো সমীকরণ এবার কাজ নাও করতে পারে। তরুণ ভোটাররাই ফল নির্ধারণ করবে। তাসনিম জারা ও রাসিন তরুণ প্রার্থী। তাদের দিকে ঝুঁকলে তারাই গেম চেঞ্জার হতে পারেন।”
তিন প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস ও অভিযোগ
হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, “আমি এ এলাকার ছেলে, ৩৮ বছর ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ভোটাররা আমাকে ঘরের লোক মনে করেন।” তবে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু চক্রান্তকারী মহল ভোটের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছে এবং প্রশাসন নিরাপত্তা দিচ্ছে না।
তাসনিম জারা বলেন, “ভোটারদের থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। আমরা শোডাউন এড়িয়ে ডোর টু ডোর ও ভলেন্টিয়ারদের মাধ্যমে প্রচার করছি। নতুন রাজনীতির বার্তা দিচ্ছি, ইতিবাচক সাড়া মিলছে।”
জাবেদ মিয়া রাসিন বলেন, “মানুষের কাছাকাছি যাওয়াই বড় পাওয়া। তবে আমাদের ব্যানার-প্ল্যাকার্ড রাতে কেটে নেয়া হচ্ছে।” তিনি আশা করেন, “মানুষ নীরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে শাপলা কলির পক্ষে রায় দেবে। ১৭ বছর পর ভোটের সুযোগ পেয়ে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।”
এসবিআর
আপনার মতামত লিখুন :