২৫ বছরের ইতিহাসে খুব ভালো অবস্থায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক: মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ

  • আবদুল হাকিম | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মে ২, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
২৫ বছরের ইতিহাসে খুব ভালো অবস্থায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক: মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ

ছবি: সোনালীনিউজ

নানান জটিলতা ও সমালোচনায় দেশের ব্যাংক খাত। বিশেষ করে দেশের শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। কিছু বড় গ্রুপ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করায় এই সংকট বড় আকার ধারণ করেছে। দেশের মানুষের কাছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর গুরুত্ব যেখানে তলানিতে, সেখানে সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক অবস্থা, আমানত, ঋণ বিতরণ ও মুনাফার প্রবৃদ্ধি, গ্রাহকসেবা উন্নয়নে ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ, সাইবার নিরাপত্তায় ব্যবস্থা, এসএমই ও কৃষি খাতে ঋণ পরিকল্পনাসহ নানান বিষয়ে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ। সাক্ষাৎকারটি লিখেছেন সোনালী নিউজের স্টাফ রিপোর্টার আবদুল হাকিম।

সোনালী নিউজ: বর্তমানে আপনার ব্যাংকের অবস্থাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: আমাদের ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা খুবই ভালো। আমরা যদি মুনাফার কথা বলি, তাহলে গত বছরের তুলনায় আমরা দ্বিগুণ মুনাফা করেছি। আমরা ৩৬৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছি, যা আগের বছর ছিল ১৬২ কোটি টাকা। সুতরাং আমরা ধারাবাহিকভাবে ভালো করছি। তাছাড়া আমাদের কোনো তারল্য সংকট সংক্রান্ত জটিলতা নেই। শুধু এ বছর নয়, আমাদের ব্যাংকে কখনো তারল্য সংকট ছিল না। বড় ক্রাইসিসের সময়েও আমাদের তারল্য সংকটে ভুগতে হয়নি। আমাদের মূল ক্যাপিটাল দিয়ে যে পরিমাণ ট্রেড বিজনেস করি, এই পরিমাণ বিজনেস আর কোনো ব্যাংক করে না। সুতরাং আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ট্রেড ফাইন্যান্স। সব কিছু মিলিয়ে যদি আমি বলি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ২৫ বছরের ইতিহাসে এখন খুব ভালো অবস্থায় আছে। এই সময়ে শরীয়াহভিত্তিক অন্যান্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমরা গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছি।

সোনালী নিউজ: আমানত, ঋণ বিতরণ ও মুনাফার ক্ষেত্রে গত এক বছরে কী ধরণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের কাছাকাছি। যেখানে পুরো ব্যাংক খাতে বিনিয়োগ গ্রোথ ৬ শতাংশ, সেখানে আমাদের গ্রোথ সাড়ে ৯ শতাংশ। আমাদের মুনাফার গ্রোথ ১৩.৪ শতাংশ। ইমপোর্ট গ্রোথ ২৪ শতাংশ, এক্সপোর্টের গ্রোথ ৬০ শতাংশ। এ সমস্ত প্যারামিটারগুলো আমাদেরকে সামনে অগ্রসর হতে আরও সহায়তা করবে। গত ৫ বছরে আমাদের কোনো লোন ক্লাসিফাইড হয়নি, এটা একটা ভালো দিক যে ব্যাংক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারছে।

সোনালী নিউজ: দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঋণখেলাপি। ঋণখেলাপি দিন দিন বাড়ছে, এখন তো এটা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঋণখেলাপিটাকে যদি থামানো না যায়, তাহলে ব্যাংকিং খাত থাকবে না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে বর্তমানে ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুব একটা ভালো না। আমরা এমনও দেখেছি অনেক ব্যবসায়ী একটা সময় ভালো করেছেন। এছাড়া নিকটতম সময়ে দেশের ব্যবসায়ীরা কোনো ধরণের সমস্যায় পড়েননি, কিন্তু এখন অনেকটাই ব্যবসায়িক মন্দায় ধাবিত হয়ে আছেন অর্থাৎ ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে আমাদেরও অনেক আগে খেলাপি ঋণের কিছু সমস্যা ছিল। তবে আমাদের জন্য আশার দিক হলো গত ৬-৭ বছরে আমাদের কোনো ঋণখেলাপি হয়নি। আগের যে ঋণখেলাপিটা ছিল সেটাই এখনো আছে, তবে আমাদের যদি সামনে ঋণখেলাপি না হয় এবং ইনভেস্টমেন্ট বাড়াতে পারি, তাহলে যেটা আছে সেটাও কমে যাবে। তবে এখানে আমাদের লিগ্যাল সিস্টেম প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই; যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, তাদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল অ্যাকশন না নেওয়া হলে যারা ভালো কাস্টমার তাদের ওপরও খারাপ দিকটার প্রভাব পড়বে। এছাড়া যারা দুষ্ট প্রকৃতির তারা আরও সাহস পেয়ে যাবে এবং ঋণখেলাপি বাড়াবে। তাই সব কিছু মাথায় রেখে কী ব্যবস্থা নিলে ঋণখেলাপি কমানো যায়, তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া এখন খুবই প্রয়োজন।

সোনালী নিউজ: ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক দুইটা আইনে চলে; একটা হলো ব্যাংক আইন, আরেকটা হলো শরীয়াহ আইন। এছাড়াও একটি বিষয় আছে গভর্নেন্স। আমাদের তো করপোরেট গভর্নেন্স কেউ মানছে না। করপোরেট গভর্নেন্স না মানাতেই কেউ শরীয়াহ মানছে না। বরং আমাদের দেশের শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর শরীয়াহ আইনের ফাঁকফোকরের মধ্য দিয়ে অনেক টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। আমাদের দেশ যেহেতু মুসলিম প্রধান দেশ, তাই মুসলিম সেন্টিমেন্টটা কাজে লাগিয়ে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো সহজভাবে সেবাগুলো পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এটার পরিবর্তে আমরা দেখলাম হিতে বিপরীত ঘটলো। এর মাধ্যমে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, এখন মানুষ শরীয়াহ ব্যাংকগুলোর বিষয়ে খারাপ ধারণা পোষণ করছে। তবে ৪৩ বছর পরে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, আমরা আশা করছি এর মাধ্যমে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো পরিচালনায় ভালো ফল বয়ে আনবে। এছাড়াও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে।

সোনালী নিউজ: সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আপনারা কী ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: গ্রাহককে সাইবার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। বিশেষ করে সাইবার সমস্যা হতে পারে সেই সংক্রান্ত ইক্যুইপমেন্টগুলো আমরা ইতোমধ্যে আপডেট করেছি। আমাদের ডিজাস্টার রিকভারির বিষয়গুলোও নতুন করে সাজাচ্ছি। আমাদের সফটওয়্যার রিলেটেড সব কিছু আমরা নতুনভাবে আপডেট করেছি। সব মিলে আমরা সিকিউরিটি বিষয়ে খুবই সতর্ক। বিশেষ করে সাইবার আক্রমণ বা অন্যান্য বিষয়ে আমরা খুবই কনসার্ন যাতে করে গ্রাহকদের সব কিছু নিরাপদ থাকে। যত ব্যয়বহুল হোক না কেন আমরা এটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ এটা ব্যাংকের লাইফ লাইন। ভালো দিক হচ্ছে সাইবার সংক্রান্ত কোনো ইস্যু এখন পর্যন্ত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের হয়নি। এখন যেভাবে আমরা এই বিষয়টি সামাল দিচ্ছি সামনেও সফলভাবে দিতে পারবো।

সোনালী নিউজ: কোন খাতগুলোকে বর্তমানে বেশি ঋণ দিচ্ছেন এবং কৃষি ও এসএমই খাতে আপনাদের কী ধরণের কাজ হচ্ছে?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: বাংলাদেশে দশটি সাসটেইনেবল ব্যাংকের মধ্যে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক অন্যতম। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তিন ক্যাটাগরি আছে ইয়োলো, গ্রিন এবং রেড সেখানে আমরা গ্রিন ব্যাংক ক্যাটাগরিতে আছি। এসএমই খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে বাধ্যবাধকতা আছে ২৫ শতাংশ, আমরা তার অনেক বেশি পজিশনে আছি। কৃষি খাতেও আমাদের বেশ কিছু প্রোডাক্ট আছে। যার মাধ্যমে আমরা রিটেইল, করপোরেট এবং এসএমই-এই খাতগুলোতে আমাদের এক ব্যালেন্স আছে। আমরা চেষ্টা করি যাতে করে আমরা বেশি করপোরেট ফোকাস না হয়ে পড়ি। আমরা চেষ্টা করি রিটেইল এবং এসএমই দিয়ে সেটা ব্যালেন্স করতে। এখন পর্যন্ত বলতে পারি ব্যাংকিং খাতে এমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই যেটা আমাদের নেই। এর মাধ্যমে আমরা শুধু ইসলামী ব্যাংকিংয়ে নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতে আমরা একটা ভালো পজিশন ধরে রাখতে চাই। আমাদের ব্যাংকে বোর্ডের কোনো চাপ না থাকায় আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারি। আমাদের বোর্ডে কোনো একক কর্তৃত্ব নেই। কোনো ব্যক্তির নামে ব্যাংক চলে না যা অন্যান্য ব্যাংকের ক্ষেত্রে দেখা যায়। যার ফলে পুরো ব্যাংক খাতে ভালো পজিশনে থাকার স্বপ্নও দেখি।

এসএইচ 

Link copied!