• ঢাকা
  • বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০

ট্রাফিক আইন মানতে অনীহা


লাইজুল ইসলাম মার্চ ২৫, ২০২৩, ০৯:২৩ পিএম
ট্রাফিক আইন মানতে অনীহা

প্রতীকী ছবি

ঢাকা: সড়কে দিনভর জানযট, রাতেও তাই। প্রায় ২৪ ঘণ্টার এই যানজটে নাকাল নগরবাসী। প্রতিদিন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এর সঙ্গে আর্থিক ক্ষতিতেও পরছে দেশ। যানজট থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছে খোদ সরকার। এ বিষয়ে করনীয় ভাবছেন অনেকেই। যানজট নিয়ন্ত্রণে অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও কোনো ভাবেই কিছু হচ্ছে না। যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। 

রাজধানীর মগবাজার, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, প্রেসক্লাব, মহাখালী, ফার্মগেটসহ প্রত্যেকটি মোড়েই যানজট লেগে থাকে। এই যানজট দূর করতে উত্তর সিটি করপোরেশন ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কাজ করছে আলাদা ভাবে। বিভিন্ন সময় পাইলট প্রকল্প হাতে নিলেও তা ভেস্তে গেছে। মূলত গড়ির এত চাপ ও ভিআইপিদের চাপে সড়কে ট্রাফিক সিগনাল ভাঙ্গতে হয়।

রমজান মাস শুরুর ঠিক আগের দিন রাস্তায় গাড়ি চলাচলে শৃঙ্খলা আরো কঠোর করতে রাজধানীর প্রত্যেকটি জোনে চালানো হয় অভিযান। এতে নেতৃত্ব দেন জোনের এসি ও এডিসিরা। যেসব বাস-প্রাইভেট কার-সিএনজি চালিত অটোরিকশার বৈধ কাগজ নেই তাদের ডাম্পিংও করেন পুলিশ কর্মকর্তারা। কিন্তু এতেও তেমন কোনো সুবিধা আসেনি সড়কে। গাড়ির চাপ রমজান কেন্দ্রীক আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সড়কে যানজট কমানোর কোনো উপায় পাওয়া যাচ্ছে না।    
ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০০ সালে ঢাকা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ৭০টি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত বাতি স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে ২০০৮ সালে তা শেষ হয়েছিল। তবে ব্যবহার না হওয়ার পাশাপাশি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কয়েক মাসের মধ্যেই অধিকাংশ বাতি অকেজো হয়ে পড়ে।

এরপর ২০১০-১১ অর্থবছরে সিটি করপোরেশন আরও একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, যার আওতায় প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল। বিশেষ এলাকা চিহ্নিত করে ২০১৫ সালে কাকলি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ১১টি পয়েন্টে সেসব স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থা চালুর পর দেখা গেছে, এতে যানজট আরও তীব্র হয়েছে।

রাজধানীর যানজট কমাতে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নসহ ইতোমধ্যে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এর কোনোটিই খুব একটা কাজে লাগেনি। দিনের বেলা শহরে ট্রাক ও আন্তঃনগর বাসের প্রবেশ বন্ধসহ বিভিন্ন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ, জেব্রা ক্রসিং বাতিল করে ফুট ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস তৈরি ইত্যাদির পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা বসানোর পরও যানজট কমানো যাচ্ছে না কেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। 

এদিকে রমজান মাসে যান চলাচলে নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এতেও তেমন কোনো ফল এখন পর্যন্ত পাওয়া শুরু করেনি নগরবাসী। ডিএমপির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীতে দূরপাল্লা-আন্তজেলা বাস টার্মিনাল এলাকায় কোনো বাস সড়কে থামিয়ে যাত্রী ওঠাবে না। টার্মিনালের ভেতরে বাস থাকাকালে যাত্রীরা আসন গ্রহণ করবেন। সংশ্লিষ্ট বাসের প্রতিনিধিদের এই বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।

ঢাকা মহানগরীতে দূরপাল্লা-আন্তজেলার কোনো বাস টার্মিনাল-সংলগ্ন প্রধান সড়কের অংশ দখল করে দাঁড়াবে না। ঢাকা মহানগরে প্রবেশ ও বাহিরপথে গণপরিবহনকে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে, যাতে কোনো অযাচিত যানজট সৃষ্টি না হয়। ঢাকা মহানগরী থেকে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার যানবাহনগুলোকে অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন থেকে বিরত থাকতে হবে। আন্তজেলা পরিবহনের যাত্রীদের প্রধান সড়কে এসে অপেক্ষা বা দাঁড়িয়ে না থেকে টার্মিনালের ভেতরে অবস্থান করতে হবে। ঢাকা মহানগরী থেকে দূরপাল্লায় রুট পারমিটবিহীন কোনো বাস চলাচল করতে পারবে না। বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই এই বিষয় কঠোরভাবে মেনে চলবে। এ ব্যাপারে তারা কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করবে। টার্মিনালভিত্তিক কাউন্টারগুলোতে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন করতে হবে। বাসের ভেতর যাত্রীদের অপরিচিত কারও কাছ থেকে কিছু না খাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট যাত্রীরা অবশ্যই যানবাহনে টিকিট বহন করবেন। যাত্রীরা তাদের মালামাল নিজ হেফাজতে সাবধানে রাখবেন। কোনো যানবাহনই ছাদের ওপর অতিরিক্ত যাত্রী বহন করবে না। যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে বাসের চালকেরা এমন কোনো অসম প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন না, যাতে সড়কের শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটে, জীবনহানির আশঙ্কা থাকে।

সকালে অফিসে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেককে পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে বাসা থেকে রওনা হতে অনুরোধ করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। এ ছাড়া ইফতারের আগ পর্যন্ত সময় হাতে নিয়ে বাসার উদ্দেশে নগরবাসীকে রওনা দিতে বলা হয়েছে। রাজধানীতে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাস ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে চলাচলের জন্য নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ট্রাফিক ব্যবস্থার এমন করুন পরিণতি নিয়ে সোনালীনিউজকে বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা সোহানুর রহমান বলেন, সকালে জ্যাম বিকেলে জ্যাম রাতেও জ্যাম। মানুষ করবেটা কি? গাড়ি নিয়ে বের হওয়া যায় না। সড়কে ভালো মানের কোনো বাসও নেই। কোনো ভাবেই আমরা যানজট থেকে বের হতে পারছি না। ট্রাফিক সিসটেমে অনিহা তৈরি হয়েছে আমাদের সবার মধ্যে। 

ব্যবসায়ী আরাফাত আলম সোনালীনিউজকে বলেন, সড়ক ব্যবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। ট্রাফিকরা এক পাশের লোকজনকে বেশি সুবিধা দেয়। আকের পাশের লোকজনকে কম সুবিধা দেয় এটাই মনে হয়। হুইসেল বাজিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা আগে যেতে চায়। আবার ওয়াকিটকিতেও বলা হয় কেউ একজন আসছেন। সেজন্য সড়কের একপাশ ধরে রেখে ভিআইপি প্রটোকলকে সুবিধা দেয়া হয়। কিন্তু এতে করে সাধারণ মানুষ কতটা ভোগান্তির মুখে পরে তা কি ঐ কর্মকর্তা বা ভিআইপি বা ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানেন?

তিনি আরো বলেন, এসব কারণে মানুষের এখন ট্রাফিক আইনের প্রতি অনিহা তৈরি হয়েছে। হাত দিয়ে থামাতে চাইলেও গাড়ি চালকরা থামতে চায় না। কে কার জন্য বসে থাকবে। সবারই বাসায় যাওয়া জরুরী।

মোটর সাইকেল চালক সিয়াম বলেন, আমি ভাড়া চালাই। যখন যেভাবে খ্যাপ পাই চালাই। উবার-পাঠাও দিয়ে তেমন লাভ আসে না। তাই খ্যাপ চালাই। কিন্তু এখন এতেও লাভ হয় না। জ্যামে বসে থাকতে হয়। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে আমাদের ক্ষতি। যাত্রীও অনেক সময় নেমে যেতে চায়। তখনই আমরা আইন অমান্য করি। একদিকে অনেকখন ছেড়ে রাখা আরেক দিকের যানবাহন আটকে রাখলে এমনই হতে থাকবে। সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে। 

রাজধানীর উত্তরার দিকে এখনো কাজ চলছে বিআরটি প্রকল্পের। ঐ এলাকায় এখনো যানজটের তীব্রতায় নাকাল বাসিন্দারা। উত্তরা থেকে রাজধানীর মতিঝিলে আসতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। বিআরটি প্রকল্পের কারণে সড়ক এখনো ভাঙ্গাচোড়া। যার কারণে যানবাহন চলাচলে রয়েছে ধীরগতি। এই অবস্থায় ঐ এলাকাগুলোর মানুষও পরিত্রাণ চায়। পুলিশ বিভাগও বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেনো কাজে আসছে না। 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান এসব বিষয়ে বলেন, আমরা রাজধানীতে যানবাহন চলাচলের একটি নির্দেশনা দিয়েছি। এই নির্দেশনা অনুযায়ী সব কিছু চলবে। কাউকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার সুযোগ নেই। তবে যারা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা বিদেশী মেহমান তাদের আমরা প্রটোকল দেই। এটা দিতে হয়। যারা আইন অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ট্রাফিক পুলিশ। 

তিনি আরো বলেন, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে আমরাও কাজ করছি। কিছু ক্ষেত্রে ব্যত্যয় হতে পারে। সেদিকে লক্ষ রেখে আমাদের কাজ চলছে। সব সময় রোজার মধ্যে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এজন্য আমাদের অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে।

সোনালীনিউজ/এলআই/আইএ

Wordbridge School
Link copied!