• ঢাকা
  • রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

দলের প্রতি অভিমান থেকে নির্বাচনে গেলেন না রওশন


নিজস্ব প্রতিবেদক  ডিসেম্বর ১, ২০২৩, ১০:০১ এএম
দলের প্রতি অভিমান থেকে নির্বাচনে গেলেন না রওশন

ঢাকা: নিজ দলের প্রতি অভিমান থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গেলেন না জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম রওশন এরশাদ। গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন। এদিনও রওশন এরশাদ এবং তার অনুসারী নেতাদের কেউ মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শর্তপূরণ না হওয়ায় তিনি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। অন্যদিকে জাপার শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ভাষ্য- রওশন এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে ১৩ আসন খালি রাখা হয়েছিল। কিন্তু তিনি নির্বাচনে না আসায় ময়মনসিংহ-৪ অর্থাৎ রওশনের আসনে আবু মোছা সরকারকে মনোনয়ন দেয় জাপা। অন্য ১২টি আসনও আর পূরণ করেনি জাতীয় পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের সঙ্গে দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম রওশন এরশাদের দ্বন্দ্ব পুরনো। একেক সময় একেক ইস্যুতে এই দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়েছে। এবারের দ্বন্দ্ব ছিল দলীয় মনোনয়ন ঘিরে। গত ১৮ নভেম্বর দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে রওশন জানান- তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট করে নির্বাচনে যেতে রাজি। একই দিন ইসিতে আরেকটি চিঠি পাঠান দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। ওই চিঠিতে তিনি জানান, দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তার স্বাক্ষরে। একই সঙ্গে দলগতভাবে বা জোটে নির্বাচনে যাওয়ার কথাও তিনি জানিয়ে দেন। ওই চিঠি থেকে একটি বার্তা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সাংগঠনিকভাবে জাতীয় পার্টিতে রওশনের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ নেই।

এর আগে নির্বাচন ইস্যুতে গত ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে সংলাপের আহ্বান জানান জিএম কাদের। যদিও সেখান থেকে বেরিয়ে এসে জানান, সেটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ। এর পর ১৯ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনে যাওয়ার কথা জানান রওশন এরশাদ। একই সঙ্গে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় পেছানোর অনুরোধও করেন।

জাতীয় পার্টি মনোনয়নপত্র বিতরণকালে দল থেকে একাধিকবার মনোনয়ন নেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও রওশন তার নিজের আসনসহ সাদ এরশাদ, মসিউর রহমান রাঙ্গা, গোলাম মসীহ, কাজী মামুন, ইকবাল হোসেন রাজু, এমএ গোফরান, এসএমএম আলম, অধ্যাপক দেলোয়ার, দয়াল কুমার বড়ুয়া, নুর ইসলাম নুরু, জিয়াউল হক মৃধা, আকতার হোসেন, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের জন্যও মনোনয়ন চান। কিন্তু রওশনের বিষয়ে জাপা চেয়ারম্যান ছাড় দিতে চাইলেও অন্যসব প্রার্থীর বিষয় আমলে নেননি। বরং জিএম কাদের লালমনিরহাটের আসনে অন্যজনকে মনোনয়ন দিয়ে তিনি রংপুর-৩ আসনে মনোনয়ন নেন। এতে করে সাদ এরশাদের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে মসিউর রহমান রাঙ্গার বিষয়ে দলের মহাসচিব জানান, রাঙ্গার দলের প্রাথমিক সদস্য পদই নেই। সুতরাং তাকে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব না।

রওশন এরশাদের দল থেকে ইতিবাচক সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি গত বুধবার রাতে তার নিজ বাসভবনে বসে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেন। এর একদিন পর রওশন এরশাদ এক বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মনোনয়ন প্রদানে অনিয়ম করেছেন। তিনি এর সমালোচনার পাশাপাশি তীব্র নিন্দা করেন। একই সঙ্গে বেগম রওশন এরশাদ এমপির (ময়মনসিংহ-৪) আসনে জনৈক আবু মুসাকে মনোনয়ন প্রদানকে ‘ধৃষ্টতা প্রদর্শন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, আসন্ন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভরাডুবির জন্য জিএম কাদেরের নেতৃত্বে একটি মহলের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।

এদিকে রওশনের আসনে আবু মোসাকে মনোনয়ন দিলেও বাকি ১২টি আসন শেষ পর্যন্ত খালি রয়েছে। এগুলো হলো- শেরপুর-২, ফরিদপুর-২, ফরিদপুর-৪, গোপালগঞ্জ-৩, শরীয়তপুর-১, সুনামগঞ্জ-২, সুনামগঞ্জ-৩, মৌলভীবাজার-৪, হবিগঞ্জ-২, লক্ষ্মীপুর-৪, চট্টগ্রাম ১০ ও চট্টগ্রাম-১১।

নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় রওশন ও তার অনুসারীরা এখন কোন পথ বেছে নেবেন? এমন প্রশ্ন এখন জাতীয় পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মনে। জানতে চাইলে রওশনের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ জানান, দলের নেতৃবৃন্দের অনিয়মে ক্ষোভ ও অভিমান থেকে রওশন এরশাদ নির্বাচনে অংশ নেননি। তবে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটি নির্বাচনের পর দেখা যাবে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, রওশন এরশাদ আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ। তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি। একপর্যায়ে তার আসন খালি রেখে মনোনয়ন ঘোষণা করি। এর পরও তিনি মনোনয়ন ফরম নেননি। অবশেষে আবু মোসাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তবে বাকি ১২টি আসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

এদিকে নির্বাচন কমিশন থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি রওশন ও তার অনুসারী কোনো নেতা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রওশন এরশাদের সঙ্গে জিএম কাদেরের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত জিএম কাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই। ২০১৮ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০১৬ সালে জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করা নিয়ে বেশ সংকটে পড়ে জাতীয় পার্টি। একপর্যায়ে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এরশাদ। পরে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। উপনেতা বানান ছোটভাই জিএম কাদেরকে। এর কিছু দিন পরই জিএম কাদেরকে সরিয়ে পুনরায় উপনেতা বানান স্ত্রী রওশন এরশাদকে। এরশাদ মারা যাওয়ার পর জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান হন। কিন্তু এ নিয়ে রওশনের সঙ্গে বিরোধ আরও বাড়ে।

এমএস  আমাদের সময়

Wordbridge School
Link copied!