• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১

জীবনের গল্পগুলোই যেন দয়ালের কনটেন্ট


ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৩, ০১:৩৬ পিএম
জীবনের গল্পগুলোই যেন দয়ালের কনটেন্ট

ঠাকুরগাঁও: গ্রামের ছেলে দয়াল। কাজ করেন ফসলের মাঠে। আর তারই বর্ণনা দিচ্ছেন ইংরেজিতে। কখনো পাওয়ার টিলার চালাচ্ছেন আবার কখনো বা ফসল নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। উচ্চারণও এত চমৎকার যে কেউ শুনে অবাক হয়ে যাবে। নিজের এই দক্ষতায় নিজের গ্রাম ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের কৃষক পরিবারের সন্তান দয়াল চন্দ্র বর্মণ। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গন্ডী পেড়িয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে এক কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ৬ মাসের মাথায় কলেজ আসা বন্ধ করে দেয় দয়াল। তবুও শত কষ্টের  মাঝেও থেমে যাননি।

মাধ্যমিকে জীবন কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায় দয়ালের। স্বজনরা থাকেন ভারতে। তার পরিবারের ইচ্ছা দয়াল যেন ভারতে গিয়ে উচ্চ শিক্ষা নেন, কিন্তু দয়ালের দেশেই কিছু একটা করার ইচ্ছে ছিলো। এমন দোটানায় এক সময় লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলেও নিজ ইচ্ছায় পরবর্তীতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিকে অংশ নেন। জমিতে কৃষিকাজ করতে করতে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলে যাচ্ছেন। প্রতিদিন লাখো মানুষ তাঁর ভিডিও দেখছে। অল্প সময়ে ফেসবুক ও ইউটিউবে অর্জন করেছেন লাখ লাখ অনুসারী। অথচ একসময় নানা টানাপড়েনে পড়াশোনাই ছেড়ে দিয়েছিলেন দয়াল। মা-বাবারও ছেলেকে নিয়ে ছিলো না তেমন কোনো বড় স্বপ্ন। কিন্তু দয়াল হাল ছাড়েননি। নিজের আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতিদিন সংগ্রাম করেছেন।

মা-বাবার চাওয়া: ছেলে চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা বড় চাকরিজীবী হোক, সন্তানকে নিয়ে এমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না পুলিন চন্দ্র বর্মনের। তাঁর চাওয়াটা ছিল খুব সরল, যেন ইংরেজিতে সুন্দর করে কথা বলতে পারে। পুলিন চন্দ্র বর্মন পেশায় কৃষক। ছেলে দয়ালকে সঙ্গে নিয়ে ফসল বুনতে বুনতেই এক ফাঁকে স্বপ্নটাও বুনে দিয়েছিলেন মনে ইংরেজি শিখতে হবে। বন্ধুরা যখন প্রাইভেট পড়ায় ব্যস্ত, দয়াল তখন ব্যস্ত ছিলেন ইংরেজির ভিতটাকে আরও মজবুত করার কাজে।

পঞ্চগড় বিষ্ণুপ্রসাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তেন তখন। কিন্তু পাশের গ্রামের প্রামাণিক পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আজগর আলীর ইংরেজি পড়ানোটা তাঁর ভালো লাগত। সেই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানেই চলত ইংরেজির চর্চা। ঘুরে দাঁড়ানোর শুরুটা তখন থেকেই।

শৈশব যেমন কেটেছে: কৃষক বাবা পুলিন বর্মণ ও মায়ের একমাত্র সন্তান দয়াল। গ্রামেই দয়াল চন্দ্রের বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকে দরিদ্রতার সঙ্গে সংগ্রাম করেই তার পথচলা। সানন্দ কিন্ডারগার্টেনে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ২০১৭ সালে পঞ্চগড় এক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর চলে যান রংপুরে বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে।

দয়াল বলেন, একাদশ শ্রেণিতে যখন ভর্তি হলাম, তখনই পারিবারিক কিছু সমস্যা দেখা দিল। আমার দুই কাকাতো ভারতে লেখাপড়া করতেন, সেখান থেকেই তাঁরা আমার মা-বাবাকে বললেন আমিও যেন ভারতে গিয়ে পড়াশোনা করি। পরিবারও সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও করতে থাকে। একপ্রকার পারিবারিক সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েই চলে যেতে রাজি হলাম। যেহেতু এখানে আর থাকছি না, ধীরে ধীরে পড়াশোনাটাও ছেড়ে দিলাম। এভাবে তিন-চার মাস সময় পার হলো। কিন্তু হঠাৎ করেই পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হলো, আমার যাওয়া আর হচ্ছে না। যেহেতু ভারতে যাওয়া হচ্ছে না, আর দেশেও পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি সব কিছু নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করলাম। তারপর ঠাকুরগাঁও ইকো কলেজে এসে ভর্তি হলাম। ভর্তি হতেই অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা চলে এলো। আমার কিছুই পড়া হয়নি। সব কিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। এভাবেই আমার আর পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়া হয়নি।

অনলাইনের শক্তি: প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থেমে গেলেও দয়াল থেমে থাকেননি। কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন, তা নিয়ে নতুন এক যাত্রা শুরু করলেন।

তিনি বলেন, মানুষ যখন জানলো আমি আর পড়াশোনা করছি না, তখন তারা আমাকে অন্যভাবে দেখা শুরু করল। বলতে লাগল আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। সেখান থেকেই আসলে নিজেকে প্রমাণ করার একটি তীব্র ইচ্ছা মনের মধ্যে পুষতে লাগলাম। তখনই অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে করতে মা-বাবাকে নিজের স্বপ্ন আর পরিকল্পনার কথা জানালেন।

দয়াল আরো বলেন, বাবা জমি বন্ধক দিয়ে আমাকে একটা ল্যাপটপ কিনে দিলেন। তার পর থেকে অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক কাজ সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম। নানা সুযোগ খুঁজতে গিয়ে ইংরেজি শেখার ওপর ঝুঁকে গেলাম। এভাবেই দু-তিন বছর নিজে নিজেই ইংরেজি চর্চা করি। এর সঙ্গে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কিছু কাজ করেও পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা শুরু করেছিলাম। ২০১৯ সালে এসে অনলাইনে ইংরেজি শেখার কিছু গ্রুপ খুঁজে পাই। অনেকেই দেখতাম ইংরেজি ভাষা ভিডিও আপলোড দিচ্ছে। তখন আমিও প্রতিদিন একটি করে ভিডিও বানিয়ে আপলোড দিতাম। বেশ প্রশংসা পাচ্ছিলাম। তা দেখে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেল। এভাবেই আমার ইংরেজিতে ভিডিও কনটেন্ট বানানোর যাত্রা শুরু হলো।

আত্মবিশ্বাসেই সাফল্য: আর্থিক সাহায্য কিংবা গাইডলাইন কোনো কিছুই পাননি দয়াল। কিন্তু তারপর নিজেকে অন্যদের থেকে কম ভাবেননি। চেষ্টা করে গেছেন কিভাবে নিজেকে আলাদা করে তুলবেন। নিজের আত্মবিশ্বাসই ছিল তাঁর অনুপ্রেরণা।

দয়াল বলেন, ‘যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, শিক্ষক হারুন স্যারের তত্ত্বাবধানে ইংরেজির গ্রামারটা আমার আয়ত্তে চলে আসে। ক্লাস নাইন পর্যন্ত ইংরেজিটা বেশ ভালোভাবে শিখেছি। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত ইংরেজি চর্চা করে যাচ্ছিলাম। একদিন বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করতে করতে ইংরেজিতে কথা বলে কয়েকটি ভিডিও বানাই। ২০২২ সালের শেষের দিকে একটি ভিডিও হঠাৎ করে বেশ ভাইরাল হয়ে যায়, যা আমি কখনোই ভাবিনি। এখন দয়াল শুধু ভিডিও বানানোতেই থেমে নেই। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডেও সমানভাবে অংশ নিচ্ছেন। অনলাইনে ইংরেজি শেখানোর কোর্স চালু করেছেন। সেমিনার, অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে গিয়ে তরুণ সমাজকে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

পুরস্কার যখন অনুপ্রেরণা: টেন মিনিট স্কুলের ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাবের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন দয়াল চন্দ্র এই ক্লাব আয়োজন করেছিল স্পোকেন ইংলিশ চ্যালেঞ্জ। দেশের হাজারো প্রতিযোগীর মধ্যে হুট করেই যখন প্রথম হয়ে যান, এই অর্জনটাই তাঁকে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করে। প্রত্যন্ত গ্রামে বসে একটা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় জিতে যাবেন, ভাবতেও পারেননি।

দয়াল বলছিলেন, ‘সত্যি বলতে আমি ফেসবুকে ভিডিও দিতাম নিজেকে যাচাই করার জন্য। কখনোই অবস্থানের কথা চিন্তা করিনি। যখন এত এত প্রতিযোগীর মধ্যে স্পোকেন ইংলিশ চ্যালেঞ্জে প্রথম হয়েছি, প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আমি চাই আমাকে দেখে অন্যরাও জানুক যে চাইলে নিজে নিজেই শেখা যায়। দয়াল নিজের সংগ্রামী জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন তাঁর ভিডিওগুলোতে। খেতে কাজ করতে করতেই তিনি ভিডিও তৈরি করেন। ফসলের মাঠ হয়ে যায় তাঁর ‘স্টুডিও। ইদানীং বিভিন্ন দাতব্য কাজের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছেন তিনি।

দয়ালের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: নিজেকে ১০ বছর পর কোথায় দেখতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে দয়াল বলেন, আমার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে সচেতনতা তৈরি করা। অনেক সুবিধাবঞ্চিত মানুষ আছে, যারা আর্থিক কিংবা পারিবারিক কারণে শেখার সুযোগ পায় না। আমি চাই, তারা নিজেদের ইচ্ছা শক্তিকে দৃঢ় করুক ও শেখার আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলুক। নিজের জায়গা থেকে চেষ্টা করে আমি যেহেতু পেরেছি, সেহেতু যে কেউই পারবে এটা আমার বিশ্বাস।

মা কুসলা রানী বলেন, আমার একমাত্র ছেলে দয়াল আমাদের গর্ব। সহজ-সরল আমার এই ছেলে কবে বড় হলো, ভাবতেই পারছি না। আজ অনেক ছেলে-মেয়ে তার কাছে ইংরেজি শিখতে আসে। তা দেখে অনেক ভালো লাগে।

স্থানীয় যুবক আরিফ বলেন, দয়াল আমাদের এলাকার জন্য সুনাম এনে দিয়েছেন। আমরা তার মাধ্যমে অনেকটাই অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমরাও ইংরেজি শেখা শুরু করেছি। একই কথা বলেন শিক্ষার্থী জনি। দয়াল দাদার ইংরেজি শুনতে খুব ভালো লাগে। আমরা তাকে দেখে চেষ্টা করছি শেখার। আমাদের এলাকার জন্য আইডল তিনি।

আটোয়ারীর বলরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি দেলোয়ার হোসাইন মুঠোফোনে বলেন, আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করলেও অনেকে ভালোভাবে ইংরেজি বলতে পারে না। সেখানে দয়াল ছেলেটি ইংরেজি বলতে পারছে। এটা অত্যন্ত ভালো দিক। এমন প্রতিভাবান ছেলেদের মেধার মূল্যায়নে এগিয়ে আসলে তারা ভবিষ্যতে অনেক ভালো করবে বলে জানান তিনি।

এমএস

Wordbridge School
Link copied!