ফাইল ছবি
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই হলো সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া, হতদরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে উঠেছে অনিয়ম ও চরম স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। প্রকৃত অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরেও কার্ড পাননি, অথচ তুলনামূলক সচ্ছল, বিত্তবান ও কোটিপতি প্রবাসী পরিবারের গৃহিণীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এই কার্ড।
উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, তেঘরিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছয়টি গ্রামের ৫০৯ জন গৃহিণীকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, এই কার্ডধারী প্রত্যেক গৃহিণী মাসে সরকারি সহায়তা হিসেবে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবেন। গত ১৭ জুন এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী সমাজের চরম দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের গৃহিণীদের এই কর্মসূচির আওতায় আনার কথা থাকলেও, বাস্তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক উল্টো চিত্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাঘৈর নগর এলাকায় সাথী বর্মন নামে এক ফ্রান্স প্রবাসীর স্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। একই এলাকায় রাখী রানী নামের এক নারীর স্বামী কুয়েতপ্রবাসী এবং ছেলে সিঙ্গাপুরে কর্মরত থাকলেও তিনি কার্ডের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এ ছাড়া নাসরিন বেগম ও নাহিদা আক্তার নামের দুই নারীর স্বামীরাও প্রবাসে থাকেন এবং তাঁরা বেশ সচ্ছল। একই এলাকার হালিমা বেগমের তিনতলা ফাউন্ডেশনের একতলা পাকা বাড়ি রয়েছে, স্বামী ফলের ব্যবসায়ী এবং ছেলে ইটভাটার ম্যানেজার। পরিবারের আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো হওয়া সত্ত্বেও হালিমা বেগমের নাম রয়েছে তালিকায়। এ বিষয়ে তাঁর ছেলে ফয়সাল জানান, তাঁর বাবার ব্যবসা রয়েছে এবং তিনি নিজে ইটভাটার ম্যানেজার। তবে কীভাবে তাঁর মায়ের নাম তালিকায় এসেছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু প্রবাসী পরিবারই নয়, যাদের নিজস্ব বহুতল ভবন, কোটি টাকার ব্যবসা কিংবা বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে মোটা অঙ্কের আয় রয়েছে, তাঁরাও এই ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। অথচ একই এলাকার বহু নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর ও অসহায় মানুষ দিনের পর দিন আবেদন করেও এই সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছেন। তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রকৃত দরিদ্রদের পরিবর্তে বিত্তবান, প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
কার্ড পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ফ্রান্স প্রবাসীর স্ত্রী সাথী বর্মন বলেন, সমাজসেবা অফিসের লোকজন সরেজমিনে এসে আমাকে যোগ্য মনে করেছে তাই কার্ড দিয়েছে। তারা কেন দিলো এটা তাদের বিষয়।
অন্যদিকে, কার্ড না পেয়ে চোখের জল ফেলছেন প্রকৃত অভাবী মানুষ। স্বামীহারা জবেদা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার স্বামী মারা গেছেন। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে খুব কষ্ট করে জীবন চালাই। আশা করেছিলাম একটা ফ্যামিলি কার্ড পাব, কিন্তু পাইনি। অথচ এলাকার কত সচ্ছল পরিবার কার্ড পেয়ে গেল। তিলাকদমা কারখানায় কাজ করে সংসার চালানো চিনু দে বলেন, মহিলা মানুষ হয়ে কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খাটি। ফ্যামিলি কার্ডটা পেলে কিছুটা উপকার হতো। কিন্তু আমার নাম তালিকায় আসেনি। যাদের ক্ষমতা আছে আর যাদের আত্মীয়-স্বজনরা নেতা, তারাই কার্ড পেয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সবচেয়ে গরিব মানুষকে সহায়তা দেওয়া। কিন্তু কেরানীগঞ্জে সমাজসেবা অফিসের চরম অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং স্থানীয় নেতাদের স্বজনপ্রীতির কারণে উচ্চবিত্ত ও প্রবাসী পরিবারগুলো কার্ড পেয়ে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যারা এই কার্ড পাওয়ার প্রকৃত হকদার, তারা বঞ্চিত রয়ে গেল।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শিবলীজ্জামান বলেন, এটি আমাদের একটি পাইলট প্রকল্প। কোনো প্রকৃত উপকারভোগী বাদ পড়ে থাকলে তাঁকে নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হবে। আবার কারও বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উমর ফারুক এ প্রসঙ্গে বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগীদের এই তালিকাটি পুনরায় খুব গুরুত্বের সাথে যাচাই করা হবে। প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারকে যেন এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসএইচ


























-6a397791a3645-20260622190839.jpg)












