ছবি : প্রতিনিধি
পাবনা: পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের মীরকামারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির আয়োজনে দিনব্যাপী লিচু উৎসব ও কৃষি বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) বিকেল ৩টায় দ্বিতীয় পর্বের লিচু উৎসব ও কৃষি বাণিজ্য মেলার আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল এমপি, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা। আরো বক্তব্য রাখেন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব, বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ( কুল ময়েজ) এবং বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য এবং ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র মোঃ মোখলেছুর রহমান বাবলু প্রমুখ।
লিচু উৎসব ও কৃষি বাণিজ্য মেলায় প্রধান অতিথি বক্তব্যের বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি বলেন, ঈশ্বরদীর বিখ্যাত লিচু সংরক্ষণে হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণাগার স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। লিচু সংরক্ষণে সবচেয়ে উপযোগী ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সমাধান খুঁজে বের করতে সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার উদ্যোগ নেবে। মন্ত্রী বলেন, “ঈশ্বরদীসহ এই অঞ্চলের মানুষ কৃষির সঙ্গে আত্মিকভাবে সম্পৃক্ত। যে অঞ্চলের মানুষের কৃষির সঙ্গে এমন সম্পর্ক রয়েছে, সেই অঞ্চলই বাংলাদেশের কৃষিতে নেতৃত্ব দিতে পারে।”
তিনি বলেন, “আমরা যাচাই করব, ঈশ্বরদীতে লিচুর জন্য কোনো সংরক্ষণাগার বা হিমাগার করা যায় কিনা। আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সমাধান হবে এমন, যা ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
লিচুর উৎপাদন ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “কৃষিমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে অবহিত করব এবং এ বিষয়ে গবেষণার অনুরোধ জানাব। গরম, কীটনাশক বা অন্য যেকোনো কারণে লিচুর যে ক্ষতি হচ্ছে, তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে কার্যকর সমাধান বের করতে হবে।”
লিচুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সংরক্ষণে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, একসময় পেঁয়াজ দীর্ঘদিন মজুত রাখা কঠিন ছিল। বর্তমানে স্বল্প ব্যয়ে ব্লোয়ার ও এক্সজস্ট ফ্যান ব্যবহার করে কয়েক মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা লিচু, আলু ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও গড়ে তোলা প্রয়োজন।
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় চার কোটি টন চাল উৎপাদিত হচ্ছে। পেঁয়াজ উৎপাদনেও বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। কৃষি খাতে উৎপাদন আরও ১০ শতাংশ বাড়ানো গেলে অনেক কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ সময় পাবনা শহরের পাশে আরও ২০০ একর জমিতে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী সম্প্রসারণের আশ্বাসও দেন তিনি।
তিনি কৃষকদের উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের প্রতিটি উদ্ভাবনী উদ্যোগে সরকারের সর্বোচ্চ সহযোগিতা থাকবে। আপনারা দোয়া করবেন, জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে, আমরা যেন সেই দায়িত্বের হক আদায় করতে পারি।”
এর আগে সকাল ১১ টায় লিচু উৎসব ও কৃষি বাণিজ্য মেলা-২০২৬’ উদ্বোধন করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব। অনুষ্ঠানের আয়োজকরা সরকারের কাছে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু, লিচু গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, লিচু প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ এবং লিচু চত্বর প্রতিষ্ঠার দাবি জানালেও পাবনা সুগার মিল বিষয়ে কোনো দাবি উত্থাপন করেননি।
ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়ার কালিকাপুরে অবস্থিত বন্ধ পাবনা সুগার মিল প্রসঙ্গে বক্তব্যে মন্ত্রী এবং আয়োজকদের কেউ না বলা প্রসঙ্গে পাবনা জেলা কৃষক দলের সহ-সভাপতি ও গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সলিমপুর ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোঃ শাহরিয়ার আহমেদ শহীদ সরদার বলেন, দ্বিতীয় বিসিক শিল্প নগরী ঈশ্বরদীতে হোক এবং বন্ধ পাবনা সুগার মিল চালুর প্রসঙ্গেসহ ঈশ্বরদীর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কিছু না বলাই তিনিসহ এই অঞ্চলের মানুষ আশাহতো হয়েছেন।
ঈশ্বরদীর বিশিষ্ট কলম লেখক সরোয়ার জামান মনা বিশ্বাস তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ঈশ্বরদীর মাটিতে দাঁড়িয়ে শিল্পমন্ত্রীর পাবনায় ২০০ একর জমিতে নতুন শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার ঘোষণা অথচ ঈশ্বরদীর নেতৃবৃন্দ নিশ্চুপ। সবাই ধৈর্য ধরুন, ঈশ্বরদীর উন্নয়ন পরিকল্পনা হয়তো একদিন আসমান থেকে নাজিল হবে।
উল্লেখ্য, নানা আশ্বাসের পরও দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়ার কালিকাপুরে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত পাবনা সুগার মিল। সরকারের পক্ষ থেকে মিলটি চালুর প্রাথমিক ঘোষণা দেওয়া হলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে অযত্ন ও অবহেলায় প্রায় ৮০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে এবং ৫৫৩ কোটি টাকার বেশি ঋণ জমেছে মিলটির কাঁধে। ১৯৯২ সালে ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়ায় ৬০ একর জমির ওপর মিলটি প্রতিষ্ঠিত হয়।ক্রমাগত লোকসান ও লোকসানের ভার সইতে না পেরে ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয় মিলটির আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে।
বর্তমানে মিলটি বন্ধ থাকলেও কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ নিয়মিত সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। মিলটি চালুর বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলেও, আখ চাষী, মিলটির কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের নিকট এটি মূলত উপেক্ষিতই থেকে গেছে। মিলটি চালুর উদ্যোগ সম্পর্কে স্থানীয় আখ চাষীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা বিরাজ করছে।
এদিকে, মেলার আয়োজকদের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও অনেকেই বিতর্ক করছেন।
এসআই
আপনার মতামত লিখুন :