বুড়িমারী-ভারত রেলপথ চালু হলে পাল্টে যাবে দেশের রাজস্ব খাত

  • লালমনিরহাট প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ১২, ২০২২, ০২:৫৪ পিএম
বুড়িমারী-ভারত রেলপথ চালু হলে পাল্টে যাবে দেশের রাজস্ব খাত

লালমনিরহাট: উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট। এ জেলার উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি, দক্ষিণে রংপুর, পূর্বে কুড়িগ্রাম ও ভারতের কোচবিহার এবং পশ্চিমে রংপুর ও নীলফামারী জেলা অবস্থিত। ভারতের খুব কাছাকাছি হওয়ায় ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারত ভূটান এবং নেপালের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে স্থলপথে মালামাল আমদানী ও রপ্তানির সুবিধার্থে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী জিরো পয়েন্টে চালু করা হয় বুড়িমারী স্থলবন্দর। আর ঠিক তখন থেকেই স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের সাথে বিভিন্ন দেশের আমদানী-রপ্তানি পরিচালনায় বুড়িমারী স্থলবন্দর দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

জানা গেছে, এ বন্দর দিয়ে ভারত, ভূটান ও নেপাল হতে কয়লা, কাঠ, পাথর, সিমেন্ট, রাসায়নিক সার, কসমেটিক সামগ্রী, পশু খাদ্য, বিভিন্ন ধরণের ফলমূল, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, চাল, ডাল, গম, বিভিন্ন ধরণের বীজ, তামাক ডাটা প্রভৃতি মালামাল দেশে আমদানী করা হয়। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা হয় ইলিশ মাছ, ঝুট, সাবান, মেলামাইনের তৈরী বাসনপত্র এবং ঔষধ সহ কতিপয় দ্রব্যসামগ্রী। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, এ বন্দর দিয়ে রেলপথ চালু হলে ভারত, ভুটান, ও নেপালের সঙ্গে পরিবহনের পথ কমে যাবে। ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থনীতিতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে আগের চেয়ে কয়েক গুণ।

রেলওয়ে সূত্র জানা যায়, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম-বুড়িমারী থেকে ভারতের মেখলিগঞ্জ-চ্যাংড়াবান্ধা রেলপথটি ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় রেলপথটি বন্ধ করে দেয় ভারত। এরপর থেকেই বন্ধ হয়ে রয়েছে এই রেলপথ। তবে এখনো দুই দিকে স্থাপিত রেলওয়ে স্থাপনাসমূহ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

বুড়িমারী স্থলবন্দর সূত্র জানায়, সময়ের প্রয়োজনে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম-বুড়িমারী থেকে ভারতের মেখলিগঞ্জ-চ্যাংড়াবান্ধা রেলপথটি চালু করা অতি গুরুত্বপূর্ণ দেখা দিয়েছে। রেলপথটির প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সাধন করে বুড়িমারী সেকশনে প্রয়োজনীয় ওয়াগন দিয়ে পণ্য পরিবহন করা হলে একদিকে যেমন রেল বিভাগের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে অপরদিকে ভারত, ভুটান ও নেপালের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পর্যটক বা যাত্রী পরিবহন করা হলে দেশের অর্থনীতিতেও গুরুতপূর্ণ ভুমিকা রাখবে। বাংলাদেশের পণ্য আমদানির দ্বিতীয় উৎস ভারত। আর সড়কপথে নেপাল ও ভূটানে রপ্তানি করতেও ভারত দিয়ে পণ্য পাঠাতে হয়। আর এইসব আমদানি-রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হয় সড়কপথে। রেলপথে আমদানি-রপ্তানির খরচ কম হলেও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ৯টি রেলপথের চারটিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।  এসবের মধ্যে বুড়িমারী স্থলপথ দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি পাথর আমদানি হয়। শুধু বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি ও ৯শ' কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়। এগুলো সড়কপথে পরিবহন করলে খরচ ও ভোগান্তি বাড়ে। এ অবস্থায় সম্ভাবনাময় বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা রেলপথ পুনঃস্থাপনের দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা রেলপথ চালু হলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়বে। 

বুড়িমারী স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি রুহুল আমীন বাবুল বলেন, ‘বুড়িমারী থেকে মাত্র সোয়া কিলোমিটার রেলপথ ভারতের চ্যাংড়াবান্ধার সঙ্গে সংযোগ দেওয়া হলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। রেলের ওয়াগনে পণ্য পরিবহন করা হলে পরিবহন ব্যয় তিন ভাগের দুই ভাগই কমবে। মিটারগেজ উঠিয়ে রেলপথকে ব্রডগেজ করে পণ্য পরিবহন করা হলে ক্রেতা-বিক্রেতা, আমদানি-রপ্তানিকারক সবাই লাভবান হবেন। 

বুড়িমারী স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী বকুল হোসেন বলেন, একদিকে ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতি, অপরদিকে মহাসড়কটির বেহাল দশার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। সড়কের কারণে অনেক সময় স্থলবন্দরে ট্রাক সংকট দেখা দেয়। এতে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে একদিকে যেমন সময় বাড়ছে, অপরদিকে অতিরিক্ত চার্জ দিয়ে  ট্রাক ভাড়া করতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদার করার জন্য এ রুটে একমাত্র সহজ উপায় হবে রেলপথ। 

এ বিষয়ে লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম বলেন, ‘এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। ৪৫ কিলোমিটার রেলপথ ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা থেকে হাতীবান্ধা উপজেলা পর্যন্ত ডুয়েলগেজ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। রেল মন্ত্রণালয় থেকে ধাপে ধাপে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ রুটের রেলপথ সম্প্রারণ করা হবে। রেলে পণ্য পরিবহন করা হলে নিঃসন্দেহে ভাড়া কম হবে। জনসাধারণ ও ব্যবসায়ীদের উপকার হবে। রেলওয়ের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা রেলপথ ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্রডগেজ-মিটারগেজ জটিলতায় বন্ধ হয়ে যাওয়া রেলপথটির দু'দিকেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো আছে। শুধু প্রয়োজন মধ্যবর্তী ৭৫০ মিটার রেললাইনের পুনঃস্থাপন’। 

সোনালীনিউজ/এসএ/এসআই

Link copied!