করোনার ধাক্কায় রাজধানীতে গড়া স্বপ্নভাঙা ব্যবসা হারিয়ে যখন দিশেহারা সময় পার করছিলেন ঝালকাঠির তরুণ উদ্যোক্তা ইছমে আজম সোহাগ, তখন কেউ ভাবেননি—এই বিপর্যয়ই একদিন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। হাল না ছেড়ে কৃষিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন তিনি। আর সেই সিদ্ধান্তই আজ তাকে এনে দিয়েছে সাফল্যের মুকুট। কুল চাষ করে এক মৌসুমেই প্রায় ১২ লাখ টাকা আয়ের পথে হাঁটছেন তিনি।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের রূপোসিয়া গ্রামের বাসিন্দা সোহাগ একসময় ঢাকায় ছোট একটি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ২০১৯ সালে করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। শুরু হয় অনিশ্চয়তার দিন। পরিবার, ভবিষ্যৎ আর সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে থাকেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সোহাগ। কিন্তু নিজস্ব জমি পর্যাপ্ত না থাকায় থেমে যাননি। সাহসী উদ্যোগ নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র ১০ বিঘা জমি ইজারা নেন। এর মধ্যে পাঁচ বিঘা জমিতে থাই জাতের আপেলকুল ও বনসুন্দরীকুলের বাগান গড়ে তোলেন, আর বাকি পাঁচ বিঘায় শুরু করেন পেয়ারা চাষ।

পেয়ারা থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না মিললেও কুল বাগান যেন সোনার খনি হয়ে ওঠে। যশোর থেকে শতাধিক উন্নত জাতের চারা এনে রোপণ করেন তিনি। মাত্র আট মাসের মাথায় গাছে ফল আসতে শুরু করে। প্রথম বছর প্রতিটি গাছে ২০ থেকে ৪০ কেজি ফলন পেলেও চলতি মৌসুমে চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। প্রতিটি গাছে গড়ে প্রায় তিন মণ পর্যন্ত কুল ধরেছে। আকারে বড়, রঙে আকর্ষণীয় আর স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় বাজারে চাহিদা তুঙ্গে।
মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি কুল ১২০ টাকা দরে বিক্রি করেন সোহাগ। বর্তমানে দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে থাকলেও বিক্রি থেমে নেই। স্থানীয় ক্রেতারা সরাসরি বাগান থেকেই কুল কিনে নিচ্ছেন। খুচরা ব্যবসায়ীরা জেলার বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করছেন। এমনকি তার বাগানের কুল লঞ্চযোগে ঢাকাতেও পাঠানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন তিনি।
সোহাগ জানান, চারা রোপণের পর বড় ধরনের অতিরিক্ত খরচ নেই। নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ ও আগাছা দমনে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক কম ব্যবহার করায় ফলের মান ভালো এবং ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে।
তার এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকায় আরও কয়েকজন বেকার যুবক কুল চাষে ঝুঁকেছেন। তাদের বাগানে আগামী বছর ফলন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঝালকাঠি জেলা কৃষি অধিদফতরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করায় ইছমে আজম সোহাগ সফল হয়েছেন। ঝালকাঠির মাটি ও আবহাওয়া উন্নত জাতের কুল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সঠিক প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এ জেলায় বাণিজ্যিক কুল চাষে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
করোনায় হারানো স্বপ্নকে পেছনে ফেলে মাটির সঙ্গে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর এই গল্প এখন ঝালকাঠিতে অনুপ্রেরণার নাম। কুলের বাগানে দাঁড়িয়ে সোহাগের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ—“কৃষিই এখন আমার ভরসা, এই মাটিই আমার ভবিষ্যৎ।”
এম
আপনার মতামত লিখুন :