দেড়শ বছরের লালকুঠি ফিরছে নতুন সাজে

  • ওবাইদুল হক, কবি নজরুল কলেজ সংবাদদাতা | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
দেড়শ বছরের লালকুঠি ফিরছে নতুন সাজে

ফাইল ছবি

রাজধানীর পুরান ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা দেড়শ বছরের বেশি পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা নর্থব্রুক হল, স্থানীয়দের কাছে পরিচিত লালকুঠি, ফিরে পাচ্ছে তার হারানো সৌন্দর্য। দীর্ঘদিন নদীর দূষণ, কারখানার ময়লা ও আবর্জনার মাঝে অবহেলায় পড়ে থাকা এই লাল ইটের ভবনটি এখন নতুন সাজে আবারও নজর কাড়ছে।

১৮৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফর উপলক্ষে এ টাউন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ১৮৮০ সালে ভবনটি উদ্বোধন করেন জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক। তাঁর নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয় নর্থব্রুক হল। লাল ইটের গাঁথুনির কারণে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ভবনটি পরিচিত হয়ে ওঠে লালকুঠি নামে। যদিও এটি মূলত টাউন হল হিসেবেই ব্যবহৃত হতো।

সরেজমিনে দেখা গেছে, একসময় অবহেলায় পড়ে থাকা এই স্থাপনাটি সরকারিভাবে সংস্কার করে আবারও নান্দনিক রূপে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা ভবনটির ঐতিহ্যবাহী কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে পুরোনো রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করছেন। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ভবনটি ঔপনিবেশিক আমলের নিপুণ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

পুরান ঢাকার সরু গলিপথ পেরিয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পাশে ফরাশগঞ্জ ও শ্যামবাজার এলাকার সংযোগস্থলে বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে লাল ইটে ঘেরা এই বিশাল দালান। লাল ইটের প্রতিটি গাঁথুনির ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের শত বছরের ইতিহাস। সংস্কারের ফলে দেড়শ বছরের পুরোনো এই লালকুঠি আবারও তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পেয়েছে। ভবনের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন কৃত্রিম ঝর্ণা, যা দর্শনার্থীদের আলাদা করে আকর্ষণ করছে।

একসময় এই নর্থব্রুক হল ছিল ঢাকার জমিদার, বণিক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলনকেন্দ্র। এখানে নিয়মিত আয়োজন হতো নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবের। কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রভাব ঢাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল এই লালকুঠিকে কেন্দ্র করেই। শুধু বিনোদন নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ভবনটির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

এই ভবনটির ইতিহাসে গর্বের একটি অধ্যায় যুক্ত হয় ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন ঢাকা মিউনিসিপালিটি ও পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এখানে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ঘটনাটি আজও লালকুঠির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

লালকুঠি দেখতে আসা কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জাহিদুল আলম বলেন, লালকুঠি শুধু একটি ভবন নয়, পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যে ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এতদিন এটি অবহেলায় পড়ে ছিল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে যেভাবে সংস্কার করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ ধরনের ঐতিহ্য সংরক্ষণ খুবই জরুরি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিক বলেন, বুড়িগঙ্গার পাড়ে এমন সুন্দর একটি স্থাপনা এতদিন নোংরা আর অবহেলায় ঢাকা ছিল। এখন সরকারিভাবে সংস্কার করে পুরোনো জৌলুষে ফিরতে দেখে গর্ব লাগে। নিয়মিত দেখভাল করা হলে এটি আর অবহেলায় পড়বে না। নতুন করে সাজানোর ফলে এখানে মানুষ ঘুরতে আসছে, ছবি তুলছে, জায়গাটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়ামিন সাদাত বলেন, লালকুঠি মানে শুধু পুরান ঢাকার একটি পুরোনো ভবন নয়, এটি সময়ের সাক্ষী। এই লাল ইটের দেয়ালের ভেতরে লুকিয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের গল্প। একসময় এখান থেকেই ঢাকার সাংস্কৃতিক চর্চা নতুন দিকনির্দেশনা পেয়েছিল। বুড়িগঙ্গার দূষণ ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছিল। এখন নতুন করে যখন লালকুঠি তার পুরোনো জৌলুষ ফিরে পাচ্ছে, তখন মনে হয় পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া আত্মাটাও যেন ফিরে আসছে। এই উদ্যোগ শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নয়, আমাদের ইতিহাস ও পরিচয় রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এসএইচ 

Link copied!