২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের হাইভোল্টেজ ম্যাচে আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ ১৬ বা কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে সুইজারল্যান্ড। ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে মুরাত ইয়াকিনের শিষ্যরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে এক দাপুটে জয় তুলে নেয়।
সুইসদের হয়ে প্রথমার্ধে ব্রিল এম্বোলো এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দান এনদোয়ে গোল দুটি করেন। আলজেরিয়া বেশ কিছু সুযোগ তৈরি করলেও ফরোয়ার্ডদের ব্যর্থতা ও সুইস ডিফেন্সের দৃঢ়তায় গোলমুখ খুলতে পারেনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দু’দল। দ্বিতীয় মিনিটেই বাঁ দিক দিয়ে দুরন্ত গতিতে উঠে আলজেরিয়ার রক্ষণে চাপ তৈরি করেন জোহান মানজাম্বি। যদিও সেই আক্রমণ থেকে বড় সুযোগ তৈরি হয়নি। ছয় মিনিটে পাল্টা আক্রমণে আলজেরিয়াও গোলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। মাজা ডান দিকে রাফিক বেলঘালিকে বল বাড়িয়ে দেন। তার নিচু ক্রস বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ছেড়ে দেন রিয়াদ মাহরেজ। বল পেয়ে হুসেম আউয়ার শট নিলেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে আফ্রিকান দলটি।
অষ্টম মিনিটে পেনাল্টির দাবিও তোলে আলজেরিয়া। রক্ষণভাগের পেছনে বাড়ানো বলে মানুয়েল আকানজির চ্যালেঞ্জে রামিজ জেররুকি পড়ে গেলে পেনাল্টির আবেদন জানানো হয়। তবে আর্জেন্টাইন রেফারি ইয়ায়েল ফ্যালকন পেরেজ সেটি নাকচ করে দেন।
এর দুই মিনিট পরই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় সুইজারল্যান্ড। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একক নৈপুণ্যে কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন মানজাম্বি। শেষ মুহূর্তে ছয় গজ বক্সের সামনে একেবারে ফাঁকা থাকা ব্রিল এম্বোলোর উদ্দেশে বল বাড়িয়ে দেন তিনি। সহজ ফিনিশে বল জালে পাঠিয়ে সুইজারল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন এম্বোলো। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল মানজাম্বির দ্বিতীয় অ্যাসিস্ট।
গোল হজমের পর সমতায় ফেরার চেষ্টা করে আলজেরিয়া। ১৪ মিনিটে আউয়ারের দূরপাল্লার শট সহজেই ধরে ফেলেন গ্রেগর কোবেল। এরপর আবারও আক্রমণের গতি বাড়ায় সুইসরা। ১৫ মিনিটে মানজাম্বির উঁচু বল থেকে সুযোগ পেলেও শট নিতে পারেননি রেমো ফ্রয়লার।
মাঝমাঠের দখল নিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে সুইজারল্যান্ড। ২৩ মিনিটে কর্নার আদায় করলেও সেটি থেকে গোল আসেনি। দুই মিনিট পর দীর্ঘ সময় বলের দখল ধরে রেখে দূরপাল্লার শট নেন রিকার্দো রদ্রিগেজ, তবে সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
হাইড্রেশন বিরতির পরও আক্রমণের ধার বজায় রাখে ইয়াকিনের দল। ৩২ মিনিটে রুবেন ভার্গাসের ক্রস আইত-নুরি ক্লিয়ার করলেও চাপ অব্যাহত রাখে সুইসরা। ৩৬ মিনিটে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থামাতে মানজাম্বিকে ফাউল করে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন ফারেস চায়েবি।
৩৭ মিনিটে ভার্গাসের ফ্রি-কিক থেকে ডেনিস জাকারিয়ার হেড ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। দুই মিনিট পর ডান দিক থেকে দান এনদোয়ের নিচু ক্রসে দ্বিতীয় গোলের অপেক্ষায় ছিলেন এম্বোলো। কিন্তু আইসা মান্দি সময়মতো হস্তক্ষেপ করে বড় বিপদ এড়ান।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে কিছুটা চাপ বাড়ায় আলজেরিয়া। ৪৩ মিনিটে আউয়ারের পাস থেকে চায়েবির শট ডিফ্লেক্ট হয়ে কোবেলের হাতে চলে যায়। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে সমতায় ফেরার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়। মাহরেজের দারুণ ক্রস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আউয়ার বল বাড়িয়ে দেন মাজাকে। কিন্তু প্রথম স্পর্শেই নেয়া শট গোলপোস্টের বাইরে চলে গেলে হতাশ হতে হয় আলজেরিয়াকে। ফলে এম্বোলোর একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় সুইজারল্যান্ড।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচ কার্যত নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নেয় সুইসরা। বিরতির পর মাঠে নেমে মাত্র ৪৮ সেকেন্ডের মাথায় আলজেরিয়ার রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নেন দান এনদোয়ে। প্রথম আক্রমণ প্রতিহত হলেও ক্লিয়ার করা বল বক্সের বাইরে পেয়ে এক টাচে নিয়ন্ত্রণে এনে দূরের কোণে দুর্দান্ত প্লেসিং শটে জাল খুঁজে নেন তিনি। মুহূর্তেই ব্যবধান হয়ে যায় ২-০।
দ্বিতীয় গোলের পর মরিয়া হয়ে ওঠে আলজেরিয়া। ৫০ মিনিটে বেলঘালির নিচু ক্রস মাহরেজের সামনে পৌঁছালেও তার প্রথম শট শেষ মুহূর্তে ব্লক করে দেন এক সুইস ডিফেন্ডার। সেটিই ছিল দ্বিতীয়ার্ধে আলজেরিয়ার সেরা সুযোগগুলোর একটি।
এরপর অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে সুইজারল্যান্ড। গ্রানিত জাকা, ডেনিস জাকারিয়া ও এম্বোলোর নেতৃত্বে মাঝমাঠের দখল ধরে রেখে একের পর এক আক্রমণ গড়ে তোলে তারা। ৬০ মিনিটে জাকারিয়ার দারুণ দৌড় থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে এম্বোলোর ক্রস কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন নাবিল বেনতালেব। কর্নার থেকেও আলজেরিয়ার রক্ষণকে চাপে রাখে সুইসরা।
ম্যাচে ফেরার আশায় একের পর এক পরিবর্তন আনেন আলজেরিয়ার কোচ। আউয়ারের বদলে জাওয়েন হাদজাম, জেররুকির পরিবর্তে আমিন গুইরি, পরে বেনতালেবের জায়গায় হিশাম বুদাউই এবং অধিনায়ক মাহরেজের পরিবর্তে আনিস হাজ মুসাকে নামানো হয়। কিন্তু এসব পরিবর্তনেও ম্যাচের চিত্র বদলায়নি।
বরং সুইজারল্যান্ড আরও গোলের সুযোগ তৈরি করতে থাকে। ৭৫ মিনিটে ফ্যাবিয়ান রিডারের শট দারুণভাবে ব্লক করেন বেলঘালি। ছয় মিনিট পর আরও সহজ সুযোগ নষ্ট করেন রিডার। জাকারিয়া ও জাকার ওয়ান-টু থেকে তৈরি আক্রমণে নিচু ক্রস এম্বোলো ও গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে তার সামনে পৌঁছালেও একেবারে ফাঁকা পোস্টে গোড়ালি দিয়ে বল জালে পাঠাতে ব্যর্থ হন তিনি।
শেষ দিকে ইনজুরিতে পড়েন আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার বেলঘালি। হাঁটতে কষ্ট হওয়ায় তাকে তুলে আদিল বুলবিনাকে নামানো হয়। অন্যদিকে নিশ্চিত জয়ের পথে এগিয়ে থাকা সুইজারল্যান্ড একে একে বিশ্রাম দেয় গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের। এম্বোলোর জায়গায় জেকি আমদৌনি, মানজাম্বির বদলে নোয়া ওকাফর, ভার্গাসের পরিবর্তে রিডার, এনদোয়ের জায়গায় মিশেল এবিশার এবং শেষ দিকে জাকারিয়ার বদলে সিলভান উইডমারকে মাঠে নামান কোচ ইয়াকিন।
ম্যাচের শেষ দিকে অন্তত একটি গোলের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালায় আলজেরিয়া। হাদজামের দূরপাল্লার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পরে আনিস হাজ মুসার ক্রস থেকে বুলবিনা বল জালে পাঠানোর সুযোগ পেলেও অফসাইডের পতাকা ওঠায় সেই সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়। যোগ করা ছয় মিনিটেও আর ম্যাচে কোনো পরিবর্তন আসেনি। শেষ মুহূর্তে আইত-নুরির ফাউল সুইজারল্যান্ডকে আরও সময় নষ্ট করার সুযোগ করে দেয়।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পিত, সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে সুইজারল্যান্ড। আক্রমণ ও রক্ষণ দুই বিভাগেই প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে থেকে ২-০ গোলের জয়ে নকআউট পর্ব পেরিয়ে যায় ইয়াকিনের দল। আর সুযোগ নষ্ট ও রক্ষণভাগের ভুলে ভরা পারফরম্যান্সে স্বপ্নভঙ্গ হয় আলজেরিয়ার।
এম
আপনার মতামত লিখুন :