ফাইল ছবি
দেশের বাজারে এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। শীর্ষ পাঁচটি আমদানিকারক কোম্পানির বিরুদ্ধে এলপিজি মজুদ করে বাজারে সরবরাহে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য জানিয়ে বিষয়টি অবিলম্বে খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে অভিযুক্ত শীর্ষ পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে রয়েছে আইগ্যাজ, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনা। গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়েছে, গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এসব কোম্পানি এলপিজির বেশ কিছু চালান আটকে রেখেছে। অথচ বাজারে চাহিদার তুলনায় এলপিজির পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার কথা। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, সেপ্টেম্বরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা আগস্টের ১ লাখ ৫৭ হাজার টনের প্রায় সমান।
এমনকি এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) তথ্যও নিশ্চিত করেছে যে, সেপ্টেম্বরে আমদানি হওয়া এলপিজি দেশের সামগ্রিক চাহিদা মেটানোর জন্য সম্পূর্ণ যথেষ্ট ছিল। তা সত্ত্বেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি অর্থাৎ দুই হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসে এই সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই কারসাজির পেছনে রয়েছে বড় ধরনের বাণিজ্যিক ফায়দা লোটার পরিকল্পনা। অক্টোবরে প্রতি টন এলপিজির দাম প্রায় ৬৪ ডলার বাড়ার কথা ছিল। চালান আটকে রাখার সময়কালের সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ের নিখুঁত মিল রয়েছে।
এনএসআইয়ের আশঙ্কা, অধিক মুনাফার আশায় ইচ্ছাকৃতভাবে আগের আমদানির চালানগুলো আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে, যাতে অক্টোবর মাসের বর্ধিত দামের সুবিধা নেওয়া যায়। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে সাধারণ ভোক্তাদের পাশাপাশি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও অস্বাভাবিক আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বড় আমদানিকারকদের কাছে থাকা এলপিজির মজুদের জরুরি হিসাব নেওয়ার কড়া নির্দেশনা দিয়েছে এনএসআই। প্রতিটি চালান আসার সময়, খালাসের তারিখ, বর্তমান মজুদ এবং বাজারে ছাড়ার সঠিক সময় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন এলপিজির আমদানি, মজুদ ও সরবরাহের গতিবিধি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সরকারের নড়েচড়ে বসার পর নড়েচড়ে বসেছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলওএবিও। সংগঠনের পক্ষ থেকে সদস্য কোম্পানি, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদনহীনভাবে এলপিজি মজুদ বা সরকার নির্ধারিত দামের বেশি নিলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে, এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে নাম আসা ওমেরা পেট্রোলিয়ামসহ কয়েকটি কোম্পানি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ওমেরার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিম চৌধুরী দাবি করেছেন, তারা বরাবরই বাজারে এলপিজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন এবং তাদের প্রতিটি চালানের সঠিক নথিপত্র রয়েছে।
বাজারের এই অস্থিরতা রুখতে সম্প্রতি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের নিয়ে অনলাইনে জরুরি বৈঠক করেছেন এবং এলপিজির বাজার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সরকার এখন কঠোর অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলি কোনো সিন্ডিকেট পার পেয়ে যেতে না পারে।
এসএইচ