• ঢাকা
  • শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

রাজশাহী পদ্মায় নৌভ্রমণে আনন্দের আড়ালে মৃত্যুঝুঁকি


রাজশাহী ব্যুরো আগস্ট ১৫, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
রাজশাহী পদ্মায় নৌভ্রমণে আনন্দের আড়ালে মৃত্যুঝুঁকি

Ydf]

রাজশাহী: বর্ষায় পদ্মা যেন ফিরে পায় নতুন জীবন। বাড়তে থাকে পানির উচ্চতা, তীব্র হয় স্রোত, আর নদীর বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অপার সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন রাজশাহীর পদ্মাপাড়ে ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের নিয়ে অনেকেই উঠছেন নৌকায়। কেউ উপভোগ করছেন নদীর ঢেউ, কেউ মুঠোফোনে ধারণ করছেন ছবি-ভিডিও। কিন্তু এই আনন্দের দৃশ্যের আড়ালেই তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ঝুঁকি। অধিকাংশ যাত্রীর গায়ে নেই লাইফ জ্যাকেট। কেউ হাতে নিয়েও পরছেন না, আবার কেউ নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে নৌকার কিনারায় বসছেন কিংবা দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ভরা পদ্মার তীব্র স্রোতে সামান্য অসাবধানতাই ডেকে আনতে পারে প্রাণহানি।

রাজশাহীর টি-বাঁধ, আই-বাঁধ, নবগঙ্গা, পদ্মা গার্ডেন ও তালাইমারি ফুলতলা ঘাট এলাকায় বর্ষা এলেই বাড়ে নৌভ্রমণের আয়োজন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোট ডিঙি ও কাঠের ট্রলারে ভিড় জমে দর্শনার্থীদের। সূর্যাস্তের সময় নদীর বুকে ভেসে বেড়ানোর আনন্দ নিতে অনেকেই ছুটে আসেন এসব ঘাটে। তবে নদীর এই মনোমুগ্ধকর রূপের বিপরীতে নিরাপত্তাব্যবস্থার চিত্র বেশ উদ্বেগজনক।

ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নৌকার অধিকাংশ যাত্রীর শরীরেই নেই লাইফ জ্যাকেট। কেউ জ্যাকেট হাতে নিয়ে বসে আছেন, আবার কেউ সেটি নৌকার এক পাশে রেখে দিয়েছেন। নৌকা চলার সময় অনেকে দাঁড়িয়ে পড়ছেন, কেউ কেউ আবার সামনের অংশে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসছেন। ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় একে অপরকে টপকে ভালো দৃশ্য পাওয়ার চেষ্টাও করছেন অনেকে। এতে নৌকার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

টি-বাঁধের মাঝি রিয়াদ বলেন, ‘নৌকায় ওঠার সময় আমরা যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরতে বলি। কিন্তু অনেকেই ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে যান কিংবা নৌকার কিনারায় বসেন। নিষেধ করলে কেউ কেউ উল্টো খারাপ ব্যবহার করেন। অথচ তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই আমরা এসব বলি।’

নৌযানে যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট রাখা এবং তা ব্যবহারের বিষয়ে নিরাপত্তা নির্দেশনা থাকলেও ঘাটের বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে মিলছে না। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বেশি দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় ছবি বা ভিডিও প্রকাশের আগ্রহে চলন্ত নৌকার সামনে গিয়ে দাঁড়ানো, লাইফ জ্যাকেট খুলে ফেলা কিংবা নৌকার একেবারে কিনারায় বসার মতো ঘটনা ঘটছে নিয়মিত।

বন্ধুদের সঙ্গে পদ্মায় ঘুরতে আসা সাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘নৌকায় উঠলে সবাই আনন্দ করি, ছবি তুলি, ভিডিও করি। তখন অনেক সময় নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় থাকে না। লাইফ জ্যাকেট হাতে নিয়েও অনেকে পরি না। কিন্তু নদীর মাঝখানে এসে বোঝা যায় ঝুঁকি কতটা। এখন মনে হয়, ছবি বা আনন্দের চেয়ে জীবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

নৌভ্রমণে আসা তাহসিনা বলেন, ‘পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে পদ্মায় ঘুরতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু পানি বাড়লে ভয়ও লাগে। বিশেষ করে ছোট নৌকায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলা বা বেশি নড়াচড়া করা খুব বিপজ্জনক। অনেককে নিষেধ করলেও তারা শোনেন না।’

বর্ষার পদ্মায় ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যায় পানির উচ্চতা ও স্রোতের কারণে। নদীর ওপর থেকে অনেক সময় পানি শান্ত মনে হলেও তলদেশে ও বিভিন্ন অংশে স্রোতের গতি একরকম নয়। ফলে নৌকার ভারসাম্য নষ্ট হলে মুহূর্তেই ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। অতীতেও পদ্মায় নৌদুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পরিবারের সদস্য, শিক্ষার্থী ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসে অনেকে আর ফিরে যেতে পারেননি। দুর্ঘটনার পর ঘাটে স্বজনদের আহাজারি হয়ে উঠেছে আনন্দের ভ্রমণের নির্মম পরিণতির সাক্ষী।

মাঝি রহমত আলী বলেন, ‘বর্ষায় নদীতে পানি বেশি থাকে, স্রোতও বেশি থাকে। বাইরে থেকে নদী শান্ত মনে হলেও অনেক জায়গায় প্রবল স্রোত রয়েছে। কিন্তু যাত্রীরা অনেক সময় কোনো কথাই শুনতে চান না। বিশেষ করে দলবেঁধে তরুণরা উঠলে বেশি সমস্যা হয়।’

নৌভ্রমণের নিরাপত্তা নিয়ে নৌপুলিশও সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের নৌপুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আমরা সবসময় যাত্রীদের সতর্ক করছি। কিন্তু অনেক যাত্রী লাইফ জ্যাকেট নিতে চান না। সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে। যাত্রীরা লাইফ জ্যাকেট না পরলে কোনো নৌকা যেন ঘাট থেকে না ছাড়ে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

সচেতন নগরবাসীরা জানান, নদীর সৌন্দর্য উপভোগে নৌভ্রমণ নিঃসন্দেহে আনন্দের। তবে সেই আনন্দ যেন এক মুহূর্তের অসাবধানতায় শোকের কারণ না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। যাত্রীদের যেমন নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হতে হবে, তেমনি নৌকার মাঝি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মানাতে হবে। লাইফ জ্যাকেট পরা, নৌকার ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী না তোলা এবং চলন্ত নৌকায় দাঁড়িয়ে বা কিনারায় বসে ছবি তোলা বন্ধ করা গেলে অনেক দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব। কারণ পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগের সবচেয়ে বড় শর্ত—নিরাপদে ঘরে ফেরা।

এসআই

Link copied!