আধ্যাত্মিক জীবনের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা মাইজভান্ডার দরবার

  • সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রাম | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৪:১২ পিএম
আধ্যাত্মিক জীবনের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা মাইজভান্ডার দরবার

ছবি: প্রতিনিধি

বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক নগরী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের মাইজভান্ডার দরবার দেশের নানা প্রান্তের ভক্ত ও অনুসারীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। এই দরবার মূলত অলিয়ে কামেল সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী–এর মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাইজভান্ডারী তরিকা এখনো পীরদের ধারাবাহিক নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে এবং ভক্তদের জীবনে আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

মাইজভান্ডারী তরিকার ধারায় খানকাহ ও পীরের আস্তানা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এখানে অনুসারীরা পীরের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা অনুসরণ করেন। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ধারাবাহিকভাবে এই তরিকা পরিচালিত হয়ে স্থানীয় সমাজে আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধের একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

তরিকার প্রাণপুরুষ সৈয়দ আহমদ উল্লাহ ১৮২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাইজভান্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ মতিউল্লাহ মাইজভান্ডারী এবং মাতা সৈয়দা খায়রুন্নেছা। পরিবারে তিনি আধ্যাত্মিক শিক্ষার ধারক ছিলেন। পূর্বপুরুষ সৈয়দ হামিদ উদ্দিন গৌড়নগরে ইমাম ও কাজীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ১২৬৯ হিজরিতে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের যশোর অঞ্চলের বিচার বিভাগে কাজী হিসেবে যোগ দেন। পরে কলকাতার মুন্সী বু আলী মাদ্রাসায় প্রধান মোদাররেস হিসেবে শিক্ষকতা করেন। হাদিস, তাফসির, ফিকহ, হিকমত ও ফারায়েজসহ ধর্মীয় নানা শাস্ত্রে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। আরবি, উর্দু, বাংলা ও ফারসি ভাষায়ও তিনি ছিলেন পারদর্শী। পরবর্তী সময়ে তিনি সুফি সাধনার পথে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন।

মাইজভান্ডারী তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি নিজেকে হযরত বড়পীর সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী–এর বংশধর বলে পরিচয় দিতেন। দিনে তিনি দ্বীনি শিক্ষা দিতেন এবং রাতে ইবাদত ও রেয়াজতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করতেন। জীবদ্দশায় বহু খলিফা নিয়োগের মাধ্যমে তরিকা বিস্তার লাভ করে।

১৮৫৭ সালে নিজ গ্রামে ফিরে এসে তিনি মাইজভান্ডার দরবার শরিফের ভিত্তি স্থাপন করেন। দরবারকে ঘিরে নানা কেরামতের ঘটনা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে মক্কা শরিফ থেকে হাজির প্রত্যাবর্তন, বাঘের মুখে লোটা নিক্ষেপ করে ভক্ত উদ্ধার এবং দীর্ঘায়ু লাভের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তীকালে সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী তরিকার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি তরিকার আদর্শ বিশ্লেষণ করে সর্বস্তরে প্রচারে উদ্যোগী হন এবং আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভান্ডারী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগঠিতভাবে শিক্ষা বিস্তার করেন।

মাইজভান্ডারী তরিকা আধ্যাত্মিক উন্নয়ন, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণকে গুরুত্ব দেয়। অনুসারীরা শরিয়ত মেনে নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত পালনের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করেন। বর্তমানে সাজ্জাদানশীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শাহ্‌ সূফী সৈয়দ এমদাদুল হক। তিনি তরিকার ঐতিহ্য ও প্রথা বজায় রেখে অনুসারীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।

তরিকার মূল শিক্ষা ‘সপ্ত-পদ্ধতি’। এর মধ্যে ফানায়ে ছালাছা বা ত্রিবিধ বিনাশ এবং মাউতে আরবা বা চতুর্বিধ মৃত্যুর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির ধারণা রয়েছে। এই পদ্ধতি অনুসারে মানুষ কুপ্রবৃত্তি ত্যাগ করে সুপ্রবৃত্তির পথে এগিয়ে যায়।

সৈয়দ আহমদ উল্লাহ ১৩২৩ হিজরি, ১০ মাঘ ১৩১৩ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ১৯০৬ সালের ২৩ জানুয়ারি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে মাইজভান্ডারে সমাহিত করা হয়। প্রতি বছর মাঘ মাসে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী ওরস অনুষ্ঠিত হয়। এতে লাখো ভক্ত সমবেত হন এবং মানত হিসেবে পশু কোরবানি ও মোমবাতি প্রদান করেন।

মাইজভান্ডার দরবার শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার স্থান নয়; এটি মানুষের নৈতিক ও সামাজিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুগের পর যুগ এই তরিকা ধর্মের সৌন্দর্য উপলব্ধি এবং মানবকল্যাণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে আসছে। এখানে আসা ভক্তরা শুধু প্রার্থনাই করেন না, বরং আধ্যাত্মিক শান্তি ও মানবতার বোধ নিয়ে ফিরে যান।

এসএইচ 
 

Link copied!