প্রেমভাঙায় ১২ বছর শিকলবন্দি জীবন, বন্ধুরা দিলেন আশার আলো

  • বরিশাল প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মার্চ ২৩, ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
প্রেমভাঙায় ১২ বছর শিকলবন্দি জীবন, বন্ধুরা দিলেন আশার আলো

ছবি : প্রতিনিধি

বরিশাল: একসময় স্বপ্নভরা এক তরুণ, মেধাবী শিক্ষার্থী যার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল পরিবার ও শিক্ষকদের বড় প্রত্যাশা। কিন্তু জীবনের এক কঠিন ধাক্কা সবকিছু বদলে দেয়। প্রেমে ব্যর্থতার পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে গত ১২ বছর ধরে শিকলবন্দি হয়ে আছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের আইচার হাওলা গ্রামের সাইদুল ইসলাম মামুন।

দীর্ঘ এই অন্ধকার সময় পেরিয়ে অবশেষে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন স্কুলজীবনের সহপাঠীরা। তাদের এই উদ্যোগে নতুন করে আলো দেখছেন মামুনের পরিবার।

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় দুই দশক আগে মামুন বাবুগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন নিয়মিত ও মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সেই সময় একই বিদ্যালয়ের এক সহপাঠীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি মেয়ের পরিবার জানতে পারলে সম্পর্কটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং মামুনের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।

এরপর থেকেই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পরিবার বাধ্য হয়ে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। গত ১২ বছর ধরে পায়ে শিকল পরিয়ে ঘরেই তালাবদ্ধ অবস্থায় দিন কাটছে তার।

মামুনের মা সোনাবান বেগম জানান, ছেলেকে সুস্থ করতে তারা কোনো চেষ্টা বাকি রাখেননি। দিনমজুর স্বামী জমিজমা বিক্রি করে চিকিৎসার ব্যয় বহন করেছেন। এমনকি এক দালালের মাধ্যমে পাবনায় চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েও প্রতারণার শিকার হন। বর্তমানে তাদের ভাঙা ঘর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

তিনি বলেন, আমার একমাত্র ছেলেকে সুস্থ করার জন্য সবকিছু করেছি। এখন আর কিছু করার সামর্থ্য নেই। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও সরকারের সহযোগিতা চাই।

শুক্রবার (২০ মার্চ) দুপুরে মামুনের বাড়িতে যান তার এসএসসি ২০০২ ব্যাচের সহপাঠীরা। তারা মামুনের চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থ সহায়তা দেন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন।

সহপাঠী মো. আল-আমিন চিশতি বলেন, মামুন খুবই মেধাবী ও ভদ্র ছেলে ছিল। আজ তার এই অবস্থা মেনে নেওয়া কঠিন। বন্ধুর এই দুঃসময়ে পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব। আমরা চাই সে আবার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক।

সহপাঠীরা জানান, তারা নিজেদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন। একই সঙ্গে সমাজের সহৃদয় ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

স্থানীয় বাসিন্দারাও এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, এটি মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেবে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন নাইম খান, শরফুদ্দীন সবুজ, হাওলাদার সবুজ, তারেক, আবুল বশার, রাসেল খান, সোহেল ঘরামি, রাশিদুল হক রনি, কাওসার হাওলাদার, মিতুসহ আরও অনেকে।

এক যুগের শিকলবন্দি জীবনের অন্ধকারে সহপাঠীদের এই সহায়তা যেন নতুন আশার প্রদীপ। এখন সবার প্রত্যাশা মামুন ফিরে পাবেন স্বাভাবিক জীবন।

পিএস

Link copied!