আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে নতুন যুগের সূচনা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ০৯:৩২ পিএম
আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে নতুন যুগের সূচনা

দেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে মানি মার্কেটের জন্য প্রথমবারের মতো কার্যকর রেফারেন্স রেট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে প্রতিদিন দুটি পৃথক রেফারেন্স রেট প্রকাশ করা হবে, যা সুদের হার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) জারি করা এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন ঋণচুক্তি, বন্ড, ফ্লোটিং রেটভিত্তিক আর্থিক পণ্য— বিশেষ করে ডেরিভেটিভসসহ নানা আর্থিক চুক্তিতে সুদের হার নির্ধারণে একটি নির্ভরযোগ্য ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য বেঞ্চমার্ক রেটের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় প্রকৃত আন্তব্যাংক লেনদেনের ভিত্তিতে প্রতিদিন দুটি মানি মার্কেট রেফারেন্স রেট নির্ধারণ ও প্রকাশ করা হবে। এর একটি হলো— Bangladesh Overnight Financing Rate (BOFR), যা রিস্ক-ফ্রি ভিত্তিক লেনদেন প্রতিফলিত করবে। অন্যটি Dhaka Overnight Money Market Rate (DOMMR), যা আনসিকিউরড আন্তব্যাংক লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, প্রতিদিনের কার্যদিবসে এই রেটগুলো হিসাব করে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত হিসাব পদ্ধতি (মেথডোলজি)ও প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে বাজার অংশগ্রহণকারীরা সহজেই তা অনুসরণ করতে পারেন।

সার্কুলারে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এই রেফারেন্স রেট অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের মানি মার্কেটে সুদের হার নির্ধারণ আরও স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে যেমন SOFR বা অন্যান্য বেঞ্চমার্ক রেট ব্যবহৃত হয়, তেমনি বাংলাদেশেও নিজস্ব নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স রেট চালু হওয়ায় আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা বাড়বে। পাশাপাশি ঋণের মূল্য নির্ধারণে অস্পষ্টতা কমে আসবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজার আরও পূর্বানুমানযোগ্য হবে।

ঘোষণাভিত্তিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা

দীর্ঘদিন ধরে দেশে সুদের হার নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ঢাকা আন্তব্যাংক অফার হার। এই পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলো যে হারে একে অপরকে ঋণ দিতে প্রস্তুত, সেই হার জানায় এবং তার ভিত্তিতে একটি গড় হার নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই পদ্ধতিতে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ব্যাংক নিয়মিতভাবে তথ্য সরবরাহ করে না, আবার অনেক ক্ষেত্রে যে হার ঘোষণা করা হয়, তা প্রকৃত লেনদেনের সঙ্গে মিলেও না। ফলে বাজারের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই পদ্ধতির কারণে সুদের হার নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাচ্ছিল। এ কারণে একটি বাস্তবভিত্তিক ও আধুনিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল।

বাস্তব লেনদেনেই নির্ধারণ হবে সুদের হার

নতুন ব্যবস্থায় সুদের হার নির্ধারণে কোনও ব্যাংকের ঘোষণাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। বরং আন্তব্যাংক বাজারে যে লেনদেন বাস্তবে সংঘটিত হবে, সেই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিদিন হার নির্ধারণ করা হবে।

এই হার নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করা হবে। ফলে কোনও ধরনের অনুমাননির্ভরতা থাকবে না এবং বাজারের প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত হবে।

হার নির্ধারণে ব্যবহার করা হবে লেনদেনের পরিমাণভিত্তিক গড় পদ্ধতি। এতে বড় অঙ্কের লেনদেন বেশি গুরুত্ব পাবে, যা হারকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলবে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী লেনদেন বাদ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে কোনও একক লেনদেন পুরো বাজারকে প্রভাবিত করতে না পারে।

বিওএফআর ও ডমর: কী পার্থক্য

বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি পৃথক রেফারেন্স হার চালু করছে, যা অর্থবাজারের ভিন্ন ভিন্ন অংশকে প্রতিনিধিত্ব করবে।

বিওএফআর নির্ধারণ করা হবে জামানতভিত্তিক আন্তব্যাংক লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো যখন নিরাপত্তা বা সম্পদ বন্ধক রেখে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয় বা দেয়, সেই লেনদেনের হার এখানে প্রতিফলিত হবে।

অপরদিকে ডমর নির্ধারণ করা হবে জামানতবিহীন আন্তব্যাংক লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো যখন কোনও নিরাপত্তা ছাড়াই একে অপরকে ঋণ দেয়, সেই লেনদেনের হার এতে প্রতিফলিত হবে। এই দুই ধরনের হার একসঙ্গে চালু হওয়ায় অর্থবাজারের সামগ্রিক চিত্র আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।

বিভিন্ন মেয়াদে হার প্রকাশ

নতুন এই ব্যবস্থায় বিভিন্ন মেয়াদে সুদের হার প্রকাশ করা হবে, যা আর্থিক খাতের বিভিন্ন চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। বিওএফআর প্রকাশ করা হবে— একদিনের, এক সপ্তাহের। ডমর প্রকাশ করা হবে— একদিনের, এক সপ্তাহের, এক মাসের ও তিন মাসের। এর ফলে ঋণচুক্তি, বন্ড, বিনিয়োগপত্র এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেনে একটি নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড পাওয়া যাবে।

তথ্য সংগ্রহ ও হিসাবের কাঠামো

সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমার লেনদেন তথ্য ব্যবহার করা হবে। সাধারণত সাম্প্রতিক কয়েক দিনের লেনদেনকে বিবেচনায় নেওয়া হবে, যাতে বাজারের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিফলিত হয়।

একদিনের হারের ক্ষেত্রে অন্তত ১০টি লেনদেন থাকতে হবে। অন্য মেয়াদের ক্ষেত্রে অন্তত ৫টি লেনদেনের শর্ত রাখা হয়েছে। যদি কোনও ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় লেনদেন না পাওয়া যায়, তাহলে পূর্ববর্তী দিনের তথ্য যোগ করে হার নির্ধারণ করা হবে। এই পদ্ধতির ফলে তথ্যের ঘাটতি থাকলেও একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত হার নির্ধারণ সম্ভব হবে।

প্রতিদিন প্রকাশ ও ব্যবহারিক সুবিধা

প্রতিদিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এই হার প্রকাশ করা হবে। এর ফলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ দিনের শুরুতেই একটি নির্ভরযোগ্য সুদের হার জানতে পারবেন। এই হার ব্যবহার করা যাবে— ঋণচুক্তি নির্ধারণে, বন্ড ও বিনিয়োগপত্রের মূল্যায়নে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায়, নতুন আর্থিক পণ্য তৈরিতে। ফলে অর্থবাজারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সহজ ও কার্যকর হবে।

নতুন যুগের সূচনা

সার্বিকভাবে, লেনদেনভিত্তিক সুদহার চালুর এই উদ্যোগকে দেশের অর্থবাজারে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সুদের হার নির্ধারণ হবে আরও বাস্তবভিত্তিক, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু একটি নতুন হার চালু নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থবাজারকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 এম

Link copied!