মাঠ প্রশাসনে তীব্র অসন্তোষ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৬, ১১:০১ এএম
মাঠ প্রশাসনে তীব্র অসন্তোষ

ফাইল ছবি

দেশের বিভিন্ন স্থানে দাবিদাওয়া আদায়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ, মিছিল ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক দলের এমন কর্মকাণ্ডে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মকানুন মেনে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। এ বিষয়ে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল বুধবার ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬-এর তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা।

উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি মিছিল উপজেলা পরিষদে গিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কক্ষের দরজায় লাথি মারেন এবং অফিসের সামনের ফুলের টব ও চেয়ার ভাঙচুর করেন।

বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ ছিল, ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬-এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের স্বচ্ছতা রক্ষা করা হয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগঘেঁষা বা তাদের ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ত্যাগী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি মাঠে গড়ানোর আগেই সারাদেশে শুরু হয়েছে নিয়োগের ‘তুঘলকি কাণ্ড’। তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, কোথাও দলীয় সুপারিশ, আবার কোথাও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীকেও বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগের তালিকা বাতিল ও পুনর্নিয়োগের দাবিতে একের পর এক উপজেলায় বিক্ষোভে নেমেছেন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। এমনকি ইউএনওদের অপসারণের দাবিও উঠেছে। ফলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করার এই কর্মসূচির শুরুতেই প্রশ্ন উঠেছে—ফ্যামিলি কার্ডের মাঠকর্মী বাছাইয়ে যোগ্যতা ও নীতিমালা প্রাধান্য পাচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় ও তদবির?

গত সোমবার গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ইউএনওর কার্যালয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। ওই দিন বিকেলে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী এবং নিয়োগে উত্তীর্ণ হতে না পারা ব্যক্তিরা ফল বাতিলের দাবিতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেন। পরে তারা ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে একটি কক্ষের জানালা এবং বারান্দায় থাকা চেয়ার ও ফুলের টব ভাঙচুর করা হয়।

এ ঘটনায় ফুলছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জয়নাল মিয়া বলেন, "আমি নিজেও সুপারভাইজার পদে আবেদন করেছিলাম। আমার নাম চূড়ান্ত তালিকায় নেই। আমার আরও দুবার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।"

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও একই অভিযোগে বিক্ষোভ হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল উপজেলা সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে সমাবেশ হয়। বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কার্যালয়ের মূল ফটক এবং উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেন। তারা ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার বদলির দাবি জানান।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে সোমবার রাতে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেছে ছাত্রদল। উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরিয়ান সরকার আরিফ ও সদস্যসচিব সোহেল রশিদ হৃদয়ের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা প্রথমে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে পলাশবাড়ী চৌমাথায় সড়ক অবরোধ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা ইউএনও আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লার অপসারণ দাবি করেন। উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরিয়ান সরকার আরিফ অভিযোগ করেন, সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সুপারভাইজার ও তথ্যসংগ্রহকারী নিয়োগে ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের’ লোকজনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নিয়োগবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়াতেই তারা বিক্ষোভ করেছেন বলে জানান তিনি।

সাদুল্লাপুরেও সোমবার রাতে বিক্ষোভ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রদল। পরে সেখানে পথসভা হয়। এ উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির সুপারভাইজার ও তথ্যসংগ্রহকারী নিয়োগে দুই দফা পরীক্ষা হয়। প্রথম দফার পরীক্ষা শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বদলিজনিত কারণে চলে যান। এরপর গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক সাদুল্লাপুরে অতিরিক্ত দায়িত্ব নেন। দ্বিতীয় দফার পরীক্ষা শেষে সোমবার বিকেলে ফল প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকেই নিয়োগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ইসতিয়াক আহমেদ সোহান ও সদস্যসচিব পারভেজ সরকার অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ মনোভাবাপন্ন কর্মকর্তারা অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন। ফল বাতিল করে নতুনভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর জন্য তারা দুই দিনের সময়সীমা দেন।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের নিয়োগ না দেওয়ার অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রশাসক মো. কায়েসুর রহমানকে উলঙ্গ করে পেটানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে যুবদল নেতা কামরুল হাসান নিসানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমা চেয়ে আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি রাজগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি প্রার্থী। এর আগে তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

সোমবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বিএনপি, ছাত্রদল এবং নিয়োগবঞ্চিত সাধারণ আবেদনকারীরা বিক্ষোভ করেছেন। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। একপর্যায়ে ইউএনও কার্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এতে উপজেলার সব দপ্তরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীরা প্রায় দুই ঘণ্টা ইউএনও কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করেন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা এবং জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের প্রাধান্য দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে তারা ইউএনও প্রিয়াংকা দাস ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সোহেল রানার অপসারণ দাবি করেন। ইউএনও কার্যালয়, সমাজসেবা কার্যালয়, শিক্ষা অফিস ও এলজিইডিসহ প্রধান দপ্তরগুলোর গেটে তালা লাগানো হয়।

ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সুপারভাইজার পদে আবেদন করে কেউ তথ্যসংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। আবার সুপারভাইজার পদে উত্তীর্ণ না হয়েও কেউ নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সুপারভাইজার ও তথ্যসংগ্রহকারী নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা ‘বিজয়ী’ হয়েছেন দাবি করে এক ছাত্রদল নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে নিয়োগ কমিটির সভাপতি আফিয়া আমীন পাপ্পা অভিযোগগুলো সত্য নয় বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, বিধিমোতাবেক লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা হওয়ায় সবাইকে পাস করানো সম্ভব নয়। মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিরাই নিয়োগ পেয়েছেন।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতেও ইউএনও ফারজানা আখতারের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে ‘কুমারখালী পতিত স্বৈরাচার বিরোধী নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে উপজেলা ছাত্রদল বিক্ষোভ সমাবেশ ও ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতাও অংশ নেয়। ৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা ইউএনও কার্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান করেন। বিক্ষোভের সময় ইউএনওর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলে তার কুশপুতুলে আগুন দেওয়া হয়। পরে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ইউএনও কার্যালয়ের গেট খুলে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তি হয়। পরে অবরুদ্ধ অবস্থায় দ্বিতীয় তলায় দাঁড়িয়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের আশ্বাস দেন ইউএনও। এরপর আন্দোলনকারীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে অপসারণের আলটিমেটাম দিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বর ত্যাগ করেন।

যশোরের কয়েকটি উপজেলাতেও নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেছেন নিয়োগপ্রত্যাশীরা। কোথাও ভাইভা না দিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা চলছে। গত রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেশবপুর ইউএনও কার্যালয় চত্বরে বিক্ষোভ করেন নিয়োগবঞ্চিতরা।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতেও ফ্যামিলি কার্ডের তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ করেছেন। ৯ আগস্ট বিকেল চারটার দিকে উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকের সামনে সমাবেশ হয়। পরে নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে ইউএনও কার্যালয়ে যান। সেখানে বিএনপির নেতারা ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের অভিযোগ ও দাবি জানান। সমাবেশে গোদাগাড়ী পৌর যুবদলের আহ্বায়ক মাহাবুবুর রহমান বিপ্লব, উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি বেলাল উদ্দিন বুশ, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি বেদার উদ্দিন বিদ্যুৎসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

মৌলভীবাজারের রাজনগরেও ফ্যামিলি কার্ড শুমারির স্বেচ্ছাসেবী বাছাইয়ের ফল প্রকাশের পর উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা চলাকালে সরকার বিরোধীদের বাছাই করা হয়েছে-এমন অভিযোগ তুলে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা উপজেলা পরিষদে জড়ো হন। এ সময় সাময়িক উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্বাস আলীসহ নেতারা পরিস্থিতি শান্ত করেন।

জানতে চাইলে মাঠ প্রশাসনে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা আইন-কানুনের মধ্যে থেকে যতটুকু সম্ভব যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করার চেষ্টা করছি। কিন্তু রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সেটি পছন্দ না হলে তারা আমাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলছেন। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। অন্যথায় মাঠ প্রশাসনে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

এসএইচ 

Link copied!