ছবি: প্রতিনিধি
কম খরচে ভালো লাভ হওয়ায় পিরোজপুর জেলায় কুল চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অনুকূল মাটি ও আবহাওয়ার কারণে জেলায় বাণিজ্যিকভাবে কুল চাষের বিস্তার ঘটছে। প্রতি বছরই নতুন নতুন কুল বাগান গড়ে উঠছে, ফলে ধানসহ প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি কুল চাষ এখন অনেক কৃষকের জন্য নতুন আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার পত্তাশী গ্রামে কৃষির চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে কৃষকেরা মূলত ধান ও কলা চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, সেখানে গত কয়েক বছরে কুল চাষ হয়ে উঠেছে নতুন ভরসা। বর্তমানে এই গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক কুল বাগান গড়ে উঠেছে। লাভের সম্ভাবনা থাকলেও পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা নিয়ে নানা প্রশ্নও রয়েছে।
এ এলাকায় আপেল কুল, বল সুন্দরী, থাই ও বাউ কুলসহ বিভিন্ন জাতের কুল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে বল সুন্দরী ও আপেল কুল বাজারে বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় কৃষকেরা এসব জাতের দিকেই ঝুঁকছেন। বর্তমানে বাগান থেকে প্রতি কেজি কুল ৯০ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে এসব কুলের চাহিদা ভালো, পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় বাজারেও যাচ্ছে পিরোজপুরের কুল।
মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষক নিজ উদ্যোগে কুল চাষ শুরু করলেও সরকারি প্রশিক্ষণ বা কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি সীমিত। কীটনাশক ও সার ব্যবহারে সঠিক নির্দেশনা না থাকায় কোথাও কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে কৃষিঋণ পেলে তারা আরও বাগান সম্প্রসারণ করতে পারবেন।
কৃষক শাহ আলম হাওলাদার বলেন, খুলনা থেকে কুলের চারা এনে প্রায় ১১ বছর ধরে তিনি কুল চাষ করছেন। বর্তমানে চার কাঠা জমিতে কুলের বাগান রয়েছে। এ মৌসুমে এক লাখ টাকার বেশি কুল বিক্রি হবে বলে তিনি আশা করছেন।
আরেক চাষি মো. জুয়েল হাওলাদার বলেন, ঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে কুল চাষে ভালো লাভ করা যায়। ঝড় হলে কিছুটা ক্ষতি হয়। এলাকায় প্রায় ১২টি কুল বাগান রয়েছে। অন্যদের সফলতা দেখে তিনিও তিন কাঠা জমিতে কুল চাষ শুরু করেছেন এবং আরও পাঁচ কাঠা জমিতে চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
মনির হাওলাদার নামে আরেক কৃষক জানান, তিনি জমি প্রস্তুত করে খুলনার পাইকগাছা থেকে চারা এনে প্রায় তিন কাঠা জমিতে বাউ কুল চাষ করেছেন। এ মৌসুমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার কুল বিক্রি হবে বলে আশা করছেন। ভবিষ্যতে বল সুন্দরী জাতের কুল চাষও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।
অসুস্থ কৃষক বেলায়েত বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কুল চাষ করলেও বর্তমানে অসুস্থ থাকায় চিকিৎসা ব্যয়ে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন তিনি সার কিনবেন নাকি ওষুধ কিনবেন তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন। কৃষিকাজে কোনো সহায়তা পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ধান চাষে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও লাভ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে কুল চাষে একবার বাগান গড়ে তুললে কয়েক বছর ধরে ফলন পাওয়া যায়, ফলে ঝুঁকি কম এবং লাভ তুলনামূলক বেশি। তবে আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে অনেক কৃষকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রায় ১৪৭ থেকে ১৬০ হেক্টর জমিতে কুল চাষ হচ্ছে এবং উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৩২১ মেট্রিক টন। কুল চাষের সঙ্গে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ কৃষক যুক্ত রয়েছেন এবং এর মাধ্যমে ৮০০ থেকে ১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও মাঠ দিবসের মাধ্যমে কুল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় কুল চাষে কৃষকেরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। সুস্বাদু হওয়ায় বাজারেও এই কুলের চাহিদা বাড়ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের বীজ এবং সার বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
এদিকে জেলার নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায়ও কুল চাষ দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। কৃষকেরা বলছেন, কার্যকর সহায়তা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো হলে পিরোজপুরে কুল চাষ আরও বড় আকারে বিস্তার লাভ করতে পারে।
এসএইচ







































