ছবি : প্রতিনিধি
ঠাকুরগাঁও: ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় স্বামীর নির্যাতন ও পারিবারিক কলহের জেরে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নিহত গৃহবধূর নাম মিতু আক্তার (১৮)। এ ঘটনায় তার স্বামী শাহিনুর ইসলাম শাহিন (চান্দু) পলাতক রয়েছেন।
ঘটনাটি শনিবার (৩০ মে) ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বন্দরপাড়া এলাকায় ঘটে। নিহত মিতু সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের শিবগঞ্জ-রামপুর এলাকার দেবারু ইসলামের মেয়ে। তার স্বামী শাহিনুর ইসলাম শাহিন আকচা ইউনিয়নের বন্দরপাড়া এলাকার মসলিম উদ্দীনের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় বছর দেড়েক আগে পারিবারিকভাবে মিতু ও শাহিনুরের বিয়ে হয়। বিয়ের পর শাহিনুর শহরের একটি ছোট মোবাইল ফোন মেরামতের দোকান দেন। পরবর্তীতে তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদকাসক্তির কারণে দোকান ছেড়ে দেয়ার পর থেকেই দাম্পত্য জীবনে অশান্তি শুরু হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকত।
স্থানীয়দের দাবি, শনিবার বিকেলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আবারও কথা কাটাকাটি ও ঝগড়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে শাহিনুর তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় মিতু আত্মহত্যার কথা বললে স্বামী তাকে বাধা না দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। পরে বাড়িতে ফিরে এসে তিনি স্ত্রীকে ঘরের ভেতরে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় দেখতে পান।
পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরে রোববার (৩১ মে) ভোররাত ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর থেকেই স্বামী শাহিনুর ইসলাম শাহিন (চান্দু) পলাতক রয়েছেন।
প্রতিবেশীরা জানান, বিয়ের পর থেকেই মিতু ও শাহিনুরের সংসারে অশান্তি লেগে ছিল। মাদকাসক্তির কারণে শাহিনুর প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন বলে তারা শুনেছেন। ঘটনার দিন বিকেলেও তাদের মধ্যে তীব্র ঝগড়া ও চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পান প্রতিবেশীরা। মিতু কয়েক মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। ২৭ দিন পর তার সিজারের তারিখ ছিল। তাকে অনেক সময় মন খারাপ করে থাকতে দেখেছি। আমরা কখনো ভাবিনি এমন একটি ঘটনা ঘটবে। ঘটনার পর থেকে শাহিনুরকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। আমরা চাই পুলিশ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করুক।
নিহত গৃহবধূর বাবা দেবারু ইসলাম বলেন, পারিবারিকভাবে আমার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ের পর থেকেই তার স্বামী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাকে নির্যাতন করত বলে মেয়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছি। অনেকবার বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছি। ঘটনার দিনও আমার মেয়েকে মারধর করা হয়েছে বলে শুনেছি। আমার মেয়ে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। আমরা নতুন অতিথির অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আজ মেয়ে আর আমার নাতি দুজনকেই হারালাম। আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাই।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহজাহান আলী বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঘটনার পর থেকে নিহতের স্বামী পলাতক রয়েছে, তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। বর্তমানে মরদেহের ময়নাতদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও আমরা অবগত আছি। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পিএস






































