ফাইল ছবি
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পাড়ি জমানো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা জল্পনা-কল্পনার মধ্যে বেশ কিছু নতুন তথ্য সামনে এসেছে। তাকে দেশত্যাগে সহায়তাকারী সামরিক কর্মকর্তা, ব্যবহৃত হেলিকপ্টার ও বিমান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পুরো রেসকিউ মিশনের বিবরণী উঠে এসেছে একাধিক সামরিক সূত্রের ভাষ্যে। তবে এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার বা সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে লাখো মানুষের জনস্রোত শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রবেশ করতে শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে জনতা গণভবনের দিকে এগোতে থাকলে পরিস্থিতি অতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে মাত্র ৩০ মিনিট সময় বেঁধে দিয়ে দ্রুত গণভবন ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর বাণিজ্যমেলার মাঠ সংলগ্ন এলাকা থেকে বিমানবাহিনীর একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টারে করে শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানাকে উদ্ধার করা হয়।
সূত্র জানায়, গণভবন থেকে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন এয়ার কমোডর আব্বাস এবং কো-পাইলট ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির। বেলা তিনটার দিকে হেলিকপ্টারটি কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে অবতরণ করে। সেই সময় তেজগাঁও বিমানবন্দরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংক্ষিপ্ত বেতার বার্তায় রেসকিউ মিশনের অধীনে সামরিক হেলিকপ্টার উড্ডয়নের তথ্য ঢাকা ট্রাফিক কন্ট্রোলকে অবহিত করেন। পরে হেলিকপ্টারের পাইলট এয়ার কমোডর আব্বাসকে পাকিস্তানের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কোর্সে পাঠানো হয় এবং তিনি কোর্স শেষে দেশে ফিরে বর্তমানে বিমানবাহিনী সদর দফতরে কর্মরত আছেন।
কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে আগে থেকেই একটি সি-১৩০ জুলিয়েট সামরিক পরিবহণ বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বিমানে শেখ হাসিনার তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর পরিবার আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন। তবে অজ্ঞাত কারণে তারিক সিদ্দিকী নিজে সেই বিমানে ওঠেননি। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম হয়ে নৌপথে দেশত্যাগ করেন, যা জানাজানি হওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েলকে গ্রেফতার করা হয়।
ভারতের উদ্দেশে রওনা দেওয়া সি-১৩০ বিমানটির ককপিটে পাইলট হিসেবে ছিলেন এয়ার কমোডর শামীম রেজা এবং কো-পাইলট ছিলেন উইং কমান্ডার মাহফুজ। নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে উড্ডয়নের সময় বিমানের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয় এবং কিছুটা ভিন্ন রুট ব্যবহার করা হয়। ফলে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রমের আগ পর্যন্ত রাডারে বিমানটি শনাক্ত হয়নি। ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশের পর পাইলট কলকাতা বিমানবন্দরের এটিসি টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বিকাল ৬টা ১৫ মিনিটে বিমানটি দিল্লির হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। পরে শেখ হাসিনাকে পৌঁছানোর পর বিমাক্রু ও নিরাপত্তাকর্মীরা ওই বিমানেই ঢাকায় ফিরে আসেন।
সামরিক সূত্রমতে, দুই ধাপে পরিচালিত এই পুরো রেসকিউ মিশনের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন বিমানবাহিনীর তৎকালীন কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মান্নাফি, যিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতা আবু আহমেদ মান্নাফির ছেলে। সরকার পতনের পর মান্নাফির পরিবার সেনানিবাসের বিমানবাহিনীর একটি সরকারি কোয়ার্টারে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপদে দেশত্যাগে সহায়তার আইনি দিক প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেজর (অব.) এম সরোয়ার হোসেন জানান, আইন অনুযায়ী পদত্যাগের পরও সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এসএসএফ নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন। ফলে নিয়োজিত কর্মকর্তারা মূলত অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্বই পালন করেছেন। তবে সংবিধান অনুযায়ী সে সময় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে যে কেউ গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে পারতেন, যা গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো।
এসএইচ







































